মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: এবার ডেঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় পদক্ষেপ ভারতের। প্রথমবারের মতো দেশে ডেঙ্গির টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ (QDENGA)-কে অনুমোদন দিল ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অব ইন্ডিয়া (DCGI)। জাপানের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা তাকেদা বায়োফার্মাসিউটিক্যালস-এর তৈরি এই টিকা ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সি ব্যক্তিদের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডেঙ্গির বাড়তে থাকা প্রকোপের মধ্যে এই অনুমোদন জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতে প্রতি বছর বর্ষা এলেই বাড়তে থাকে ডেঙ্গির প্রকোপ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত মোট মানুষের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ভারতের বাসিন্দা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১ লক্ষ ১৩ হাজার জন ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন। ডেঙ্গির কারণে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। এতদিন পর্যন্ত ভারতে ডেঙ্গির কোনও অনুমোদিত টিকা ছিল না। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণ, জমা জল পরিষ্কার রাখা এবং সচেতনতাই ছিল সংক্রমণ রুখতে প্রধান ভরসা। সেই জায়গায় কিউডেঙ্গার অনুমোদনকে ডেঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় অগ্রগতি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কী এই কিউডেঙ্গা (QDENGA)?
কিউডেঙ্গা (QDENGA) একটি টেট্রাভ্যালেন্ট ডেঙ্গির টিকা। অর্থাৎ এটি ডেঙ্গি ভাইরাসের চারটি ধরন- ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪ সবকটির বিরুদ্ধেই সুরক্ষা দিতে পারে। এই টিকার আরও একটি বড় সুবিধা হল, টিকা নেওয়ার আগে কোনও ব্যক্তির আগে ডেঙ্গি হয়েছিল কি না? তার পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না।
কারা তৈরি করেছে?
কিউডেঙ্গা (QDENGA) তৈরি করেছে জাপানের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা তাকেদা বায়োফার্মাসিউটিক্যালস। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে আসার পর থেকে এই টিকা ৪৩টি দেশে অনুমোদন পেয়েছে। সংস্থার দাবি, ইতিমধ্যেই ৩ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি ডোজ বিতরণ করা হয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ একাধিক দেশে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার মাধ্যমে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল ভারতও।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কী মত?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ‘হু’ (WHO) কিউডেঙ্গাকে প্রি-কোয়ালিফায়েড ভ্যাকসিন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যেসব দেশে ডেঙ্গির প্রকোপ বেশি বা নিয়মিত সংক্রমণ দেখা যায়, সেখানে এই টিকা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে ‘হু’। কিউডেঙ্গার মান, নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতা সন্তোষজনক বলে বিবেচিত হয়েছে। এরপর ২০১৯ সালের নিউ ড্রাগস অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস রুলস অনুযায়ী টিকাটির ব্যবহারে অনুমোদন দেয় ভারতের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিসিজিআই (DCGI)।
ট্রায়ালে কী ফল মিলেছে?
টাকেডার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ২৮ হাজারেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী অংশ নেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ফেজ-৩ ‘টাইডস (DEN-301)’ ট্রায়ালটি আটটি দেশে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের উপর চালানো হয়। ট্রায়ালের ফলাফলে দেখা গিয়েছে- দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার এক বছর পর ডেঙ্গি সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকারিতা ছিল ৮০.২ শতাংশ। টিকা নেওয়ার ১৮ মাস পর ডেঙ্গির কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে কার্যকারিতা ছিল ৯০.৪ শতাংশ।
কীভাবে দেওয়া হবে টিকা?
কিউডেঙ্গার দুটি ডোজে দেওয়া হবে। প্রতিটি ডোজের পরিমাণ ০.৫ মিলিলিটার। প্রথম ডোজ নেওয়ার তিন মাস পরে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে।
ভারতে কবে পাওয়া যাবে?
অনুমোদন মিললেও এখনই বাজারে পাওয়া যাবে না কিউডেঙ্গা। টাকেডা জানিয়েছে, ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে ভারতের বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার মাধ্যমে টিকাটি বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদনও বাড়ানো হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ১০ কোটি ডোজ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে সংস্থাটি।
শুধু টিকা নয়, সচেতনতাও জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউডেঙ্গা ডেঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলেও এটি কোনও একমাত্র সমাধান নয়। টিকাকরণের পাশাপাশি মশার বংশবিস্তার রোধ, জমা জল পরিষ্কার রাখা, মশারি বা রিপেলেন্ট ব্যবহার এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও সমান জরুরি। তবে ভারতের মতো ডেঙ্গি-প্রবণ দেশে এই প্রথম অনুমোদিত টিকা ভবিষ্যতে সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে বলেই আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply