মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বিনা লড়াইয়ে থামল সূর্যের বিজয়রথ। সুপার এইটে বড় ধাক্কা। টি-২০ বিশ্বকাপে (T20 World Cup 2026) দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) কাছে ৭৬ রানে হেরে গেল ভারত। ১৮৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১১১ রানে অল আউট টিম ইন্ডিয়া। ১২ ম্যাচে জয়ের পর হার। অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের (Suryakumar Yadav) স্পষ্ট দাবি—হারের দায় ব্যাটিংয়ের। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে এই আমেদাবাদেই ভারতের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল, রোহিতদের বিজয়রথ থেমেছিল, সেখানেই ফের মুখ থুবড়ে পড়ল সূর্যের ভারত (Indian Cricket Team)। শুধু হার নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টিম ইন্ডিয়া এতই বড় ব্যবধানে পরাজিত হলে যে ভারতের বিশ্বকাপ ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়ে গেল।
২০২২ সালের পর আইসিসি টি-টোয়েন্টি-তে হার
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ১৮৮ রান তাড়া করতে নেমে রবিবার মাত্র ১১১ রানেই অল আউট হয়ে যায় টিম ইন্ডিয়া। গ্রুপ পর্বে অপেক্ষাকৃত কমজোরি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোনও রকমে সামাল দেওয়া গিয়েছিল। পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় ছাড়া কোনও ম্যাচেই সেভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি গুরু গম্ভীরের ছাত্ররা। সুপার এইটে নামতেই বাস্তব পরিস্থিতির সামনে পড়ল ভারত। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ৭৬ রানের বিরাট ব্যবধানে হেরে গেল সূর্যকুমার যাদবের দল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পরাজয়ের পর এই প্রথম কোনও একাধিক দেশের টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে পরাজিত হল ভারতীয় দল। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গের পর এই প্রথম আইসিসি প্রতিযোিগতার ম্যাচে হারের সম্মুখীন হল মেন ইন ব্লু-রা।
পাওয়ারপ্লেতেই ভাঙন
রান চেজের শুরুতেই ভাঙন। প্রথম ওভারে শূন্য রানে আউট ঈশান কিষাণ (Ishan Kishan)। তিলক বর্মা (Tilak Varma) ১, অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma) ১৫—পাওয়ারপ্লের শেষে স্কোর ৩১/৩। শুরুতে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় টিম ইন্ডিয়া। এই কারণে ম্যাচের পর সূর্যকুমার বলেন, ‘১৮৮ তাড়া করতে গেলে পাওয়ারপ্লেতে ম্যাচ জেতা না গেলেও হেরে যাওয়া যায়। আমরা এই পর্যায়েই বেশি উইকেট হারিয়েছি। ছোট ছোট জুটি গড়তে পারিনি।’ পরিসংখ্যান বলছে, কাল ভারতের ব্যাটাররা থিতু হতে পারেননি। বড় শট খেলতে গিয়ে নিয়মিত উইকেট পড়েছে। স্ট্রাইক রোটেশনও হয়নি ঠিকমতো। ফলে রান তোলার চাপ ক্রমশ বেড়েছে।
মিডল অর্ডারে ধীরগতি
পাওয়ার-প্লে-তে ব্যাকফুটে চলে গিয়েও নিজেদের কৌশল থেকে সরলেন না গম্ভীর, সূর্যকুমাররা। ঈশান, অভিষেক ফিরে যাওয়ার পরেও চলল সেই টুকটুক করে ব্যাটিং। পরিস্থিতির বিচার না করেই ধরে খেলতে গিয়ে বিপদ ঘনিয়ে এল। দক্ষিণ আফ্রিকাও ২০ রানে ৩ উইকেট হারিয়েছিল। তাই বলে ডেভিড মিলার এবং ডেওয়াল্ড ব্রেভিস ‘টেস্ট’ খেলার রাস্তায় হাঁটেননি। পাল্টা মারের রাস্তায় হেঁটে ভারতীয় বোলারদের চাপে ফেলে দিয়েছিলেন। ভারত সেটাই করতে পারল না। ধরে খেলতে গিয়ে নিজেদের উপর চাপ এতটাই বাড়িয়ে ফেলল যে পরের দিকে আর সামলানো গেল না।
ব্যাটিং ব্যর্থতাই দায়ী
ম্যাচ শেষে ব্যাটিং ব্যর্থতাকেই পরাজয়ের কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন অধিনায়ক সূর্য কুমার। কিন্তু পরিকল্পনা কই? ভারতের ব্যাটারদের খেলা নিয়ে প্রতি ম্যাচেই প্রশ্ন থাকছে। কেউ না কেউ পারফরম্যান্স করে ম্যাচ বার করে দিচ্ছিলেন ঠিক, কিন্তু কঠিন প্রতিপক্ষের সামনে সেই চাল চলে না। তখন টি-টোয়েন্টি হোক বা টেস্ট, ক্রিকেট বুঝিয়ে দেয় এটা ওয়ান-ম্যান গেম নয়, টিম গেম। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলাররা যেখানে একের পর এক মন্থর বল করছেন, তা খেলার জন্য কেন পরিকল্পনা থাকবে না ব্যাটারদের? অনুশীলনে ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটাকের কাজটা কী? আগের চারটি ম্যাচে ওপেনিং জুটি টিকতে পারেননি। মূলত অভিষেক শর্মার ব্যর্থতার জন্যই। এ দিন সেই তালিকায় নাম লেখালেন ঈশান কিশন। অভিষেকের বদলে তিনি স্ট্রাইক নিয়েছিলেন। চতুর্থ বলেই তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন এডেন মার্করাম। অভিষেক কোনও মতে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ১৫ রান করলেন। তবে যে বলে আউট হলেন তাতে শিক্ষানবিশ ক্রিকেটারও লজ্জা পাবেন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রতি ম্যাচে ওপেনারেরা এ ভাবে ব্যর্থ হলে সাফল্যের আশা করা যায় না।
কেন নেই অক্ষর প্যাটেল
আমেদাবাদের পিচে কী ভাবে বোলিং করতে হয়, তা ভারতকে শিখিয়ে গেল দক্ষিণ আফ্রিকা। কেশব মহারাজের মতো বোলার যেখানে এক ওভারে তিনটি উইকেট তুলে নিলেন, সেখানে ভারতের স্পিনারদের প্রাপ্তি মাত্র একটি উইকেট। বরুণ চক্রবর্তী ভারতের স্ট্রাইক বোলার। তিনি এমন বল করলেন যে লোকানো যাচ্ছিল না। শেষ ওভারে ডেভিড মিলারকে আউট করলেন ঠিকই। তত ক্ষণে মিলার যা ক্ষতি করার করে দিয়েছেন। আমেদাবাদের পিচে খেলে বড় হয়েছেন অক্ষর প্যাটেল। মাঠ থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে নাদিয়াদে থাকেন। তিনি দলের সহ-অধিনায়কও বটে। তাঁকেই কি না এই ম্যাচ থেকে বাদ দেওয়া হল? যে কোনও দিন অলরাউন্ডার হিসেবে ওয়াশিংটনের থেকে অক্ষর এগিয়ে থাকবেন। তার উপর তাঁর ঘরের মাঠে দলের বাইরে অক্ষর। মাঠে বল হাতে থাকলে দক্ষিণ আফ্রিকার আরও ২০ রান হয়তো কমতে পারত। যে ২০ রানই ২০ ওভারের ক্রিকেটে মানসিক ফারাক গড়ে দেয়।
সূর্যদের শেষ-চারের পথ
এই পরাজয়ের পর ভারতের আর ভুলত্রুটির কোনও অবকাশ নেই। সুপার এইটে সব দলই তিনটি করে ম্যাচ খেলবে। ভারতীয় দল নিজেদের পরের ম্যাচগুলি খেলবে জিম্বাবোয়ে (Zimbabwe) এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের (West Indies) বিরুদ্ধে। ভারতীয় দলকে এই দুই ম্যাচে জিততে তো হবেই। পাশাপাশি টিম ইন্ডিয়াকে আশা করতে হবে প্রোটিয়া দলও যেন বাকি দুই প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে। তাহলে সেক্ষেত্রে দুই ম্যাচ জিতে গ্রুপ ১ থেকে দ্বিতীয় দল হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছে যাবে টিম ইন্ডিয়া। তবে এর অন্যথা হলে? দক্ষিণ আফ্রিকা যদি জিম্বাবোয়ে বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পরাজিত হয়, তাহলে সমস্যায় পড়বে ভারত।
বিশ্বকাপ ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
প্রোটিয়াদের বিরুদ্ধে এত বড় ব্যবধানে হারের ফলে ভারতের (India vs South Africa) নেট রান রেটও বেশ ধাক্কা খেয়েছে। এই হারে ভারতের নেট রান রেট নেমে গেছে মাইনাস ৩.৮০০-তে। সুপার এইটে এখন পরিস্থিতি জটিল। তাই ভারতীয় দলকে সেক্ষেত্রে নিজেদের ম্যাচ বড় ব্যবধানে জিততে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পরাজয় শুধু পয়েন্ট নয়, আত্মবিশ্বাসেও ধাক্কা। তবে অধিনায়ক সূর্যকুমার পরিষ্কার জানিয়েছেন, এটা ঘাবড়ানোর নয়, ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। সূর্য বলেন, ‘আমরা আমাদের ব্র্যান্ডের ক্রিকেটই খেলব। ব্যাট, বল, ফিল্ডিং—সব বিভাগেই উন্নতি করতে হবে। তারপর সময় বলবে।’

Leave a Reply