মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর (Operation Sindoor) ফলে অসহায় বোধ করেছিল পাকিস্তান। আট মাস নীরবতার পর অবশেষে একথা মানল ইসলামাবাদ। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আওতায় চালানো নির্ভুল ও কৌশলগত হামলার প্রভাব স্বীকার করলেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইশাক দার। দিলেন পরিসংখ্যানও। দাবি, সিঁদুর অভিযানের সময় টানা ৩৬ ঘণ্টা ধরে ৮০টি ড্রোন হামলা করেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ রাওয়ালপিন্ডির নূর খান এয়ারবেসে আঘাত লেগেছিল, ক্ষতি হয়েছিল পরিকাঠামোর, আহত হয়েছিলেন পাক বায়ুসেনার একাধিক জওয়ান, এ কথা প্রথমবার সরকারি ভাবে মেনে নিলেন ইশাক।
৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ৮০টি ড্রোন হামলা
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও বিদেশমন্ত্রী ইশাক দার এক সাংবাদিক বৈঠকে জানান, মে মাসের শুরুতে ভারত পাকিস্তানের ভিতরে একাধিক ড্রোন পাঠিয়েছিল। তাঁর দাবি, ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ৮০টি ড্রোন ঢুকেছিল পাকিস্তানের আকাশসীমায়। তার মধ্যে ৭৯টি তারা ভূপাতিত করতে পেরেছে বলে দাবি করলেও, একটি ড্রোন নূর খান এয়ারবেসে আছড়ে পড়ে। তাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাকিস্তান বায়ুসেনার এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। দারের কথায়, ওই ঘটনায় কয়েক জন পাক সেনা জওয়ান আহতও হন। মে মাসে ভারতের হামলায় পাকিস্তানের একাধিক সামরিক ঘাঁটি যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তা এত দিন কার্যত অস্বীকারই করে এসেছে ইসলামাবাদ। কিন্তু হঠাৎ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল পাকিস্তান। প্রকাশ্যেই পুরোটা স্বীকার করল পাকিস্তান সরকার।
ভারতের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি কার্যত স্বীকার
উল্লেখ্য, ভারত ২০২৫ সালের ৭ মে ভোররাতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে। এর পেছনে ছিল ২৬ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাওঁ-এ সন্ত্রাসীদের হাতে ২৬ জন নিরীহ নাগরিকের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ওই হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। ইশাক দারের এই বক্তব্য পাকিস্তানের পূর্ববর্তী অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্টভাবে বিপরীতমুখী। এতদিন ইসলামাবাদ ভারতের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি কার্যত অস্বীকার বা খাটো করে দেখিয়ে এসেছে। কিন্তু এবার নূর খান বিমানঘাঁটিতে ক্ষতির কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেল। তবে এই স্বীকারোক্তির মধ্যেও দার বিতর্কিত দাবি তুলতে ভোলেননি। তিনি আবারও বলেন যে, ৭ মে’র আকাশযুদ্ধে পাকিস্তান সাতটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে যার পক্ষে কোনও প্রমাণ তিনি দেননি। পাশাপাশি তিনি পুনরায় পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি আসতে পারে কেবল জম্মু ও কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের মাধ্যমেই।
নূর খান বিমানঘাঁটিতে পুনর্গঠনের কাজ চলছে
সম্প্রতি প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে, নূর খান বিমানঘাঁটিতে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। যা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় ঘাঁটিটি উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। ইসলামাবাদ থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিমানঘাঁটি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অন্যতম কৌশলগত কেন্দ্র, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ মজুত থাকে। ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল, তা এখনও নিশ্চিত করেনি। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, নূর খান ঘাঁটিতে আঘাত হানতে ভারত সম্ভবত ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল, ফরাসি তৈরি স্কাল্প (SCALP) এয়ার-লঞ্চড ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল, অথবা উভয়ই ব্যবহার করেছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় ব্রহ্মোস নিক্ষেপ করা হয় ভারতীয় বায়ুসেনার সু-৩০ যুদ্ধবিমান থেকে এবং স্কাল্প ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় রাফাল যুদ্ধবিমান থেকে। সব মিলিয়ে, ইশাক দারের স্বীকারোক্তি শুধু পাকিস্তানের সরকারি অবস্থানের বড় পরিবর্তনই নয়, বরং ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব যে ইসলামাবাদ গভীরভাবে অনুভব করেছে, তারও স্পষ্ট প্রমাণ।
ভয় পেয়েছে পাকিস্তান
ইশাক দার আরও দাবি করেন, এই সংঘর্ষ থামাতে আমেরিকার বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সৌদি আরবের বিদেশমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও তাঁর সংযোজন, ‘আমরা কখনও যুদ্ধ চাইনি।’ নূর খান এয়ারবেস পাকিস্তান বায়ুসেনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। রাওয়ালপিন্ডির চাকলালা এলাকায় অবস্থিত এই ঘাঁটি কার্যত ইসলামাবাদের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় এই ঘাঁটির পাশাপাশি সরগোধার মুশাফ, জ্যাকবাবাদের শাহবাজ, করাচির ভোলারি, মুরিদকে ও রফিকি এয়ারবেসও ভারতীয় হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি।
পাল্টা প্রতিক্রিয়া ভারতের
পাকিস্তানের এই স্বীকারোক্তির পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া এসেছে ভারত থেকেও। সেনাবাহিনীর প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট জেনারেল কনওয়ালজিৎ সিং ধিলোঁ ইশাক দারের বক্তব্যকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘ইশাক দার মিথ্যা বলতেই অভ্যস্ত। তবে শেষ পর্যন্ত সত্যটাই বেরিয়ে আসে।’ তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম সামা টিভি নিজেই ১৪ অগস্ট, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে, ১৩৮ জন সেনাকে মরণোত্তর বীরত্ব পদক দেওয়ার খবর প্রকাশ করেছিল। ধিলোঁর দাবি, এই সংখ্যা থেকেই বোঝা যায়, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পাকিস্তানের প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০-র মধ্যে। এর আগেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ স্বীকার করেছিলেন, ৯-১০ মে রাত আড়াইটে নাগাদ সেনাপ্রধান আসিম মুনির তাঁকে ফোন করে নূর খান এয়ারবেসে হামলার কথা জানিয়েছিলেন। জুলাই মাসে তাঁর উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ আরও এক ধাপ এগিয়ে জানান, ভারতের ছোড়া ব্রহ্মোস ক্রুজ মিসাইল নূর খান এয়ারবেসের দিকেই আসছিল। ইসলামাবাদের হাতে তখন মাত্র ৩০ থেকে ৪৫ সেকেন্ড ছিল বোঝার জন্য, ওই ক্ষেপণাস্ত্রে কোনও নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড রয়েছে কি না।
স্বীকারোক্তি পাকিস্তানের
এই সব দাবির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে স্যাটেলাইট ছবিও। মার্কিন সংস্থা ম্যাক্সার টেকনোলজির ১৩ মে তোলা ছবিতে নূর খান, মুশাফ, ভোলারি ও শাহবাজ; এই চারটি পাকিস্তানি এয়ারবেসে স্পষ্ট ক্ষতির চিহ্ন দেখা যায়। হামলার আগে ২৫ এপ্রিল এবং হামলার পরে ১০ মে তোলা ছবির তুলনায় ধ্বংসের মাত্রা চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে, ইশাক দারের সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি পাকিস্তানের এত দিনের বয়ানকে কার্যত উল্টে দিল বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহল।

Leave a Reply