Chicken’s Neck: মাটির তলা দিয়েই যাবে সেনার রসদ! চিকেন’স নেক রক্ষায় ভূগর্ভস্থ রেলপথ, মাস্টার স্ট্রোক ভারতের

chicken's neck with underground rail india's master stroke to china bangladesh pakistan

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের কৌশলগতভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর অন্যতম ‘চিকেন’স নেক’ (Chicken’s Neck) বা শিলিগুড়ি করিডর। দীর্ঘদিন ধরেই এই সংকীর্ণ ভূখণ্ড ভারতের জন্য এক বড় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এবার সেই দুর্বলতাকেই শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। শিলিগুড়ি করিডরের প্রায় ৪০ কিলোমিটার অংশে ভূগর্ভস্থ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। রেলমন্ত্রী জানান, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ রক্ষায় এই করিডরের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান রেললাইন চার লাইনে উন্নীত করার পাশাপাশি ২০–২৪ মিটার গভীরে ভূগর্ভস্থ রেলপথ বসানোর কাজ চলছে। এই ভূগর্ভস্থ রেললাইনটি পশ্চিমবঙ্গের তিন মাইল হাট থেকে রাঙাপানি পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

কেন তিন মাইল হাট–রাঙাপানি?

ভৌগোলিক কারণেই রাঙাপানি ও তিন মাইল হাট এই দুই স্টেশনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তিন মাইল হাট শিলিগুড়ি থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে এবং বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছাকাছি। বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা এখান থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ফলে এই অংশটি কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ। চিকেন নেকের (Chicken’s Neck) সুরক্ষায় বছর দেড়েক আগেই কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রকে ভূগর্ভস্থ রেলপথ (Underground railway) তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিল ভারতীয় সেনা। সেই প্রস্তাব মেনে স্পর্শকাতর এলাকায় সমীক্ষাও করে রেল ও প্রতিরক্ষামন্ত্রকের যৌথ দল। মাস ছয়েক আগে সেই সমীক্ষা রিপোর্ট জমা হয় কেন্দ্রের কাছে। সেইমতো উত্তর দিনাজপুরের তিন মাইল হাট থেকে শিলিগুড়ির রাঙাপানি পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ রেলপথ তৈরির কথা ঘোষণা করলেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব (Ashwini Vaishnaw)। সেনা সূত্রের খবর, ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ রেলপথ অসম পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হতে পারে। জাতীয় সুরক্ষায় ওই রেলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই জানিয়েছেন সেনাকর্তারা।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেন’স নেক’?

চিকেন’স নেক হল প্রায় ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি সংকীর্ণ ভূখণ্ড, যা ভারতের মূল অংশকে আটটি উত্তর-পূর্ব রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। জাতীয় সড়ক, রেললাইন, জ্বালানি পাইপলাইন এবং সামরিক রসদের প্রধান সরবরাহ পথ এই করিডরের মধ্য দিয়েই যায়। এই করিডরের দক্ষিণে বাংলাদেশ, পশ্চিমে নেপাল এবং উত্তরে চিনের চুম্বি ভ্যালি। চুম্বি ভ্যালিতে চিনের সেনাবাহিনীর কৌশলগত সুবিধা থাকায় সংকটের সময় একাধিক দিক থেকে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এই করিডরে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই উত্তর-পূর্ব ভারত কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশে ভারতের সামরিক অবস্থানেও।

ভূগর্ভস্থ রেল কেন এত জরুরি?

রেলপথই দ্রুততম পণ্য ও সেনা পরিবহণের মাধ্যম—একটি মালবাহী ট্রেন প্রায় ৩০০টি ট্রাকের সমান বোঝা বহন করতে পারে। বর্তমানে চিকেন’স নেকের বেশিরভাগ পরিকাঠামোই ভূপৃষ্ঠে অবস্থিত, যা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সন্দীপ উন্নিথান জানিয়েছেন, ভূগর্ভস্থ রেলপথ হলে আকাশ, আর্টিলারি বা ড্রোন হামলা থেকে তা অনেকটাই সুরক্ষিত থাকবে। সংঘর্ষের পরিস্থিতিতেও সেনা, জ্বালানি ও জরুরি সামগ্রীর নিরবচ্ছিন্ন পরিবহণ সম্ভব হবে। তাঁর কথায়, “ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামো শনাক্ত করা কঠিন এবং প্রথম আঘাত সামলানোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর।”

আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট

গত এক দশকে চিন ডোকলাম ও অরুণাচল সীমান্তে ব্যাপক পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কিছু চরমপন্থী মহল থেকে চিকেন’স নেক বিচ্ছিন্ন করার হুমকিও শোনা গেছে। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশের রংপুরের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ—যা শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি—নয়াদিল্লির কৌশলগত মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ভারতের পাল্টা প্রস্তুতি

এই পরিস্থিতিতে ভারতও একাধিক পদক্ষেপ করেছে। পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরায় থাকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিগুলি ফের চালু করা হচ্ছে। বাংলার চোপড়া, বিহারের কিশানগঞ্জ ও অসমের লাচিত বরফুকনে নতুন সেনাঘাঁটি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, হলদিয়ায় একটি নতুন নৌঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। গত বছর রেলভিত্তিক মোবাইল লঞ্চার থেকে ‘অগ্নি প্রাইম’ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে ভারত, যা রেলপথে ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহণ ও মোতায়েনের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

শিলিগুড়ি করিডরের কৌশলগত গুরুত্ব স্পষ্ট

শিলিগুড়ি করিডরের কৌশলগত গুরুত্ব যে দিল্লির কাছে কতটা, তা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল। রেলের অন্দরমহলের খবর, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড করিডর’-এর সুরক্ষায় বিশেষ পদক্ষেপও করা হবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে সুড়ঙ্গপথ তৈরি করা যায়, তার জন্য ইঞ্জিনিয়ারদের বিশেষ দল গড়বে রেল। রেলমন্ত্রী স্পষ্টই জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের জন্য টাকার কোনও অভাব হবে না। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল ইতিমধ্যেই ডিপিআর তৈরির কাজ শুরু করেছে। যেহেতু শিলিগুড়ির মাটি পাথুরে নয় এবং এলাকাটি সমতল, তাই এখানে টানেলের জন্য মাটি কাটা অনেক সহজ হবে। রেলের বাস্তুকারদের দাবি, কাজ শুরু হলে খুব দ্রুতই সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ শেষ করা যাবে।

যুদ্ধের সময় সেনার ‘লাইফলাইন’

এই প্রেক্ষাপটে শিলিগুড়ি করিডরে ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণ শুধুমাত্র একটি পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নয় এর গুরুত্ব ব্যাপক। চিন ও বাংলাদেশের দিক থেকে সম্ভাব্য দ্বিমুখী চাপের মুখে দীর্ঘদিনের কৌশলগত দুর্বলতাকে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয়ে রূপান্তর করার দিকেই ভারতের এই উদ্যোগ। এক কথায়, ‘চিকেন’স নেক’কে দুর্বল গলা নয়, এবার শক্ত মেরুদণ্ডে পরিণত করার পথে এগোচ্ছে ভারত। যুদ্ধের সময় সেনার ‘লাইফলাইন’ হতে পারে ওই সুড়ঙ্গপথ। প্রাক্তন সেনাকর্তারা মনে করছেন, আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন আর স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কত ট্যাঙ্ক বা সেনা পাঠানো হচ্ছে সব ওপর থেকে দেখে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু মাটির নীচে রেললাইন থাকলে শত্রুর চোখে ধুলো দেওয়া সহজ হবে। সুড়ঙ্গপথে সেনা আর রসদ সীমান্তে পৌঁছে দেওয়া যাবে। বাগডোগরা বিমানঘাঁটি কাছে থাকলেও খারাপ আবহাওয়ায় আকাশপথ সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। তাই অনেকসময় রেলই হয়ে ওঠে মূল ভরসা।

চিকেনস নেক ঘিরে নয়া নিরাপত্তা বলয়

ইতিমধ্যে চিকেনস নেক ঘিরে নয়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। নতুন ডিজাইনের বেড়ায় ঢেকেছে ৭৫ শতাংশ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা। আধুনিক বেড়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শক্তিশালী নজরদারি ক্যামেরা এবং উন্নত এরিয়া ডমিনেশন ব্যবস্থা। সীমান্তে পাতা পড়লেও এখন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) নজরে আসবে। সেই সঙ্গে আত্মরক্ষার জন্য ঢাল করা হয়েছে এস-৪০০ ডিফেন্স সিস্টেম। রাশিয়ার কাছ থেকে কেনা সারফেস-টু-এয়ার মিসাইলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে সীমান্তে। এছাড়াও ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত চিকেনস নেক রক্ষায় বাংলাদেশ সীমান্তের পাশে অসমের ধুবড়ি সংলগ্ন বামুনি, বিহারের কিশনগঞ্জ এবং উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া এলাকায় তিনটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে।

চিকেনস নেক মাস্টারস্ট্রোক দিল মোদি সরকারের

গোয়েন্দা সূত্রে খবর, ভারতকে দুর্বল করতে শিলিগুড়ি করিডরকেই পাখির চোখ করেছে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন। তিনটি দেশের সীমান্ত এক জায়গায় মেশায় এই পথে অস্ত্রশস্ত্র, মাদক ও জাল নোট ভারতে পাচার করার ছক কষেছে জঙ্গিরা! পাশাপাশি সীমান্তের ছিদ্রপথে সন্ত্রাসবাদীদের এদেশে প্রবেশের রাস্তা তৈরি করারও পরিকল্পনা রয়েছে। এই চিকেনস নেক টার্গেট পাকিস্তানেরও। এই অঞ্চলকে ভারতের থেকে আলাদা করে দিতে চায় চিনও। ওই কারণে ভারতীয় বিমান বাহিনীর জরুরি অপারেশনাল সুবিধা বাড়াতে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের পাঁচটি পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপ অথবা বিমানঘাঁটি চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে নয়াদিল্লি। এবার মাটির তলায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার স্ট্র্যাটেজিক রেল করিডর গড়ার কথা ঘোষণা রেল মন্ত্রকের। বাংলাদেশের ইউনূস সরকারের ‘শকুনের চোখ’ শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন’স নেক-এর দিকে। বার বার উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রসঙ্গ টেনেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূস। ভারত তো আর চুপ করে বসে থাকবে না। ইতিমধ্যেই চিকেনস নেক-এ সেনা বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত। এবার রেলপথেও মাস্টার স্ট্রোক দিল মোদি সরকার। যার নির্যাস, শত্রুরা কোনও ভাবে হামলা করলেও রেল যোগাযোগে সেনার কাছে সহজেই রসদ পৌঁছে যাবে। রেলপথে কোনও প্রভাব পড়বে না।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share