মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবৈধ কার্যকলাপের অভিযোগে এক মার্কিন ভাড়াটে সেনাসহ (US Mercenary in India) ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিককে গ্রেফতারের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) পুরনো এক সতর্কবার্তা। ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে তিনি দাবি করেছিলেন, এক “শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি” তথা এক বিদেশি শক্তি বাংলাদেশ ও মায়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে একটি “খ্রিস্টান রাষ্ট্র” গঠনের পরিকল্পনা করছে। যার কেন্দ্র হতে পারে বঙ্গোপসাগর। তখন এই মন্তব্যকে অনেকেই রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ—বিশেষ করে বিদেশি যোদ্ধাদের উপস্থিতি—কিছু বিশ্লেষকের মতে সেই বক্তব্যকে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তুলছে।
বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস
পশ্চিম এশিয়া জুড়ে যুদ্ধের পরিস্থিতি। সেই আবহে ভারতে বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস হয়েছে। আমেরিকার বাসিন্দা, এক ভাড়াটে যোদ্ধাকে গ্রেফতার করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। গ্রেফতার করা হয়েছে ইউক্রেনের ছয় নাগরিককেও। মিজোরাম হয়ে মায়ানমারে ঢোকার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। মায়ানমারে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে তারা যুদ্ধের কলা-কৌশল শেখাতে, অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতে যাচ্ছিল বলে জানা যাচ্ছে। বিগত কয়েক মাস ধরে নজরদারি চালিয়ে ওই সাতজনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে বলে খবর। ধৃতদের মধ্যে আমেরিকার নাগরিক ম্যাথু অ্যারন ভ্যান ডাইক (Matthew VanDyke), ইউক্রেনের নারিক হারবা পেত্রো, স্লাইভিয়াক টারাস, ইভান সুকমানোভস্কি, স্টেফানকিভ মারিয়ান, হানচারুক মাকসিম এবং কামিনস্কি ভিক্টর বলে শনাক্ত করা গিয়েছে। ধৃতদের ডিজিটাল গতিবিধি পরখ করে দেখছে এনআইএ ধৃতদের নেটওয়র্কে অন্য সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার চেষ্টাও চলছে।
ভ্য়ানের গ্রেফতারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
তদন্তে নেমে বেশ কিছু অডিও রেকর্ডিং হাতে পেয়েছেন তদন্তকারীরা। সেখানে বিভিন্ন দেশে বিদ্রোহী সংগঠনগুলিকে সমর্থন জোগানোর কথা স্বীকার করতে শোনা গিয়েছে আমেরিকার নাগরিক ভাড়াটে সেনা ভ্যানকে। তার দাবি, বিদেশি যোদ্ধাদের বিদ্রোহে লিপ্ত করা তার উদ্দেশ্য় নয়। বরং স্থানীয় মানুষজনকে বিদ্রোহের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করাই লক্ষ্য তার। ভেনেজুয়েলা, মায়ানমার এবং ইরানে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে ভাড়াটে সৈনিকদের আহ্বানও জানায় সে। ভ্য়ানের গ্রেফতারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতে সশস্ত্র উগ্রপন্থী সংগঠনগুলির যে বাড়বাড়ন্ত, তাতে তার সংযোগ পাওয়া গিয়েছে। উগ্রপন্থীদেরও সে ড্রোনের মাধ্যমে হামলা চালানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে ভ্য়ানের গ্রেফতারি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। ভ্যান চরবৃত্তিতে লিপ্ত ছিল কি না, তথ্য পাচার করছিল কি না, ভারতবিরোধী, নিষিদ্ধ গোষ্ঠীগুলিকে মদত জোগাচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হাসিনার সতর্কবার্তার যোগসূত্র
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই গ্রেফতারির সঙ্গে শেখ হাসিনার সেই সতর্কবার্তার সম্ভাব্য যোগ থাকতে পারে। তিনি দাবি করেছিলেন, তাকে ক্ষমতায় ফেরাতে সাহায্যের বিনিময়ে বাংলাদেশে একটি বিদেশি ঘাঁটি তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। হাসিনা তখন বলেছিলেন, বাংলাদেশ ভেঙে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি আরও অভিযোগ করেছিলেন, একটি শক্তিশালী দেশ বঙ্গোপসাগরে ঘাঁটি বানাতে চায়। তিনি তা হতে দিচ্ছেন না বলেই তাঁর সরকারের সামনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাঁকে ভোটের আগে এই ঘাঁটি বানানোর অনুমতি দেওয়ার বদলে, সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে, অভিযোগ করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। তবে, কোনও বিশেষ দেশের নাম করেননি হাসিনা।
খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র
হাসিনা দাবি করেন, ইন্দোনেশিয়ার ভেঙে যেমন পূর্ব তিমুর তৈরি করা হয়েছিল, সেই রকমই বাংলাদেশ ও মায়ানমারের একটা অংশ নিয়ে একটা খ্রিস্টান দেশ তৈরির চক্রান্ত চলছে। হাসিনা বলেন, “ভারত মহাসগাগরের এই শান্তিপূর্ণ জায়গাটার উপর তাদের নজর। এখানে বেস বানিয়ে তারা কোথায় হামলা করতে চায়? আমার যুদ্ধ ঘরে-বাইরে, সব জায়গায়। পূর্ব তিমুরের মত বাংলাদেশের একটি অংশ নিয়ে, তারপর চট্টগ্রাম, মায়ানমার মিলে এখানে একটা খ্রিষ্টান দেশ বানাবে। বঙ্গোপসাগরে একটা ঘাঁটি করবে।” প্রাচীনকাল থেকেই বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে ব্যবসা-বাণিজ্য চলে আসছে। শেখ হাসিনা কোনও দেশের নাম না করলেও, তাঁর ইঙ্গিত যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে, সেটা স্পষ্ট ছিল। ভ্যান-এর গ্রেফতারি তাঁর সেই কথাকে ফের আলোচনায় নিয়ে এল।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ
মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ: ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মায়ানমারে চলমান সংঘর্ষে বহু আন্তর্জাতিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে পক্ষ নিচ্ছে—এমন অভিযোগ নতুন নয়।
ভারতের উত্তর-পূর্ব: উত্তর-পূর্ব ভারত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক কৌশলগত করিডর। মিজোরাম এবং সংলগ্ন অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সংযোগস্থল, পাশাপাশি চীনের প্রভাব বলয়ের কাছাকাছি। বিদেশি যোদ্ধাদের উপস্থিতি, মায়ানমারের অস্থিরতা ভারতের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত ক্রমশ একটি সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে।
‘প্রক্সি ওয়ার’ তত্ত্ব: বিশেষজ্ঞ মহলের র মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি একটি বৃহত্তর ‘প্রক্সি ওয়ার’-এর ইঙ্গিত হতে পারে, যেখানে বড় শক্তিগুলি সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে স্থানীয় গোষ্ঠীগুলিকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে।
মিজোরাম হয়ে মায়ানমার—নতুন করিডর?
মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমা আগেই জানিয়েছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধফেরত যোদ্ধারা মিজোরাম হয়ে মায়ানমারের চিন প্রদেশে যাচ্ছে এবং বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ২০০০ বিদেশি আইজলে এলেও তাদের বেশিরভাগকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি—যা সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনায় নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলি মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। যদিও “খ্রিস্টান রাষ্ট্র” তৈরির অভিযোগ নিয়ে এখনো কোনও সরকারি নিশ্চিতকরণ মেলেনি, তবুও ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে কৌতূহল ও উদ্বেগ দুটোই বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে মার্কিন ভাড়াটে যোদ্ধা ম্যাথিউ ভ্যানডাইক-এর গ্রেফতারি।

Leave a Reply