Prashant Bose Die: এলগার পরিষদ–ভীমা কোরেগাঁও মামলার অন্যতম অভিযুক্ত মাওবাদী নেতা প্রশান্ত বোসের মৃত্যু

prashant bose died he is a maoist leader who plotted to kill pm modi kingpin in koregaon bhima case

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মারা গেলেন নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠনের প্রথমসারির নেতা, রয়েছে বাংলা-যোগ, পূর্ব ভারতের একাধিক জায়গায় নাশকতামূলক কাজের মাস্টারমাইন্ড— প্রশান্ত বোস। দেশ ‘মাওবাদী মুক্ত’ ঘোষণার ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন যাদবপুরের ভূমিপুত্র জেলবন্দি এই প্রবীণ মাওবাদী নেতা। পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার ঝাড়খণ্ডের সরকারি হাসপাতাল আরআইএমএস-এ মারা গিয়েছেন প্রবীণ এই মাওবাদী নেতা। কিষান দা নামেও পরিচিত প্রশান্তর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। গত চার বছর ধরে ঝাড়খণ্ডে বিরসা মুণ্ডা কারাগারে বন্দি ছিলেন তিনি। রাঁচির এসএসপি রাকেশ রঞ্জন পিটিআই-কে জানিয়েছেন, সেদিন সকালে আচমকা প্রশান্তর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। চিকিৎসা চলাকালীন তিনি মারা যান।

সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সদস্য

নিষিদ্ধ ঘোষিত এই সংগঠনের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এই বাঙালি মাওবাদী। বর্তমানে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নম্বলা কেশব রাওয়ের ঠিক পরেই তাঁর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সদস্য হওয়ার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘ সময় পূর্ব আঞ্চলিক ব্যুরোর সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন। মাওবাদী শিবিরে তিনি ‘মনীশ’ বা ‘বুদ্ধ’ নামেও সমান পরিচিত ছিলেন। কেবল রণকৌশল নির্ধারণ নয়, দলের তাত্ত্বিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্র— এই সাতটি রাজ্যে মাওবাদী আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বহুলাংশে তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল বলেই মনে করেন গোয়েন্দারা।

পুরুলিয়া হয়ে কলকাতা আসার পথে গ্রেফতার

২০২১ সালের ১২ নভেম্বর সরাইকেলা-খাসাওয়ান জেলার কান্দ্রা টোল ব্রিজের কাছ থেকে প্রশান্ত বসু ও তাঁর স্ত্রী শীলা মারান্ডিকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। সেই সময় তাঁর মাথার ওপর ১ কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে এই বাউন্টি ঘোষণা করেছিল ঝাড়খণ্ড সরকার। মাওবাদী দলের এক সূত্রের কথায়,‘কিডনির চিকিৎসার জন্য স্ত্রী শীলা মারান্ডির সঙ্গে পুরুলিয়া হয়ে কলকাতা আসার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই গোপন খবর গোয়েন্দাদের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় তিনি ধরা পড়ে যান। কীভাবে এই গোপন খবর গোয়েন্দাদের কাছে পৌঁছল তা নিয়ে দলের অন্দরে এরাজ্যে সংগঠনের দায়িত্বে থাকা এক নেতার ভূমিকা সন্দেহের চোখে দেখা হয়।’

বাম চরমপন্থী আন্দোলনের এক প্রভাবশালী মুখ

দেহরক্ষী সহ গ্রেফতারের সময় এই শীর্ষ মাওবাদী নেতার গাড়ি থেকে নগদ টাকা, মোবাইল, পেন ড্রাইভ, দুটি ডেটা কার্ড উদ্ধার করেছিল ঝাড়খণ্ড পুলিশ। এই পেন ড্রাইভ, ডেটা কার্ড থেকে উদ্ধার হওয়া গোপন তথ্যকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযানে বড়সড় সাফল্য পায় কেন্দ্রীয় বাহিনী। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ২০০টিরও বেশি মাওবাদী নাশকতামূলক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যোগ ছিল তাঁর। মূলত পশ্চিমবঙ্গের ভূমিপুত্র হয়েও সারা ভারতের বাম চরমপন্থী আন্দোলনের এক প্রভাবশালী মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

প্রশান্ত বোসের গ্রেফতারি ‘সবচেয়ে বড় সাফল্য’

প্রশান্ত বসুকে গ্রেফতারের সময় রাঁচিতে এক প্রেস কনফারেন্সে তৎকালীন ইন্সপেক্টর জেনারেল (অপারেশনস) অমল ভিনুকান্ত হোমকার জানিয়েছিলেন, ওই বছরের ১২ নভেম্বর প্রশান্ত বসু ও তাঁর স্ত্রী-সহ মোট ছয়জন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। আইজি আরও জানিয়েছিলেন, ‘কিষাণ দা’ নামে পরিচিত প্রশান্ত বসুকে ঝাড়খণ্ডের কোলহান অঞ্চল থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। নির্দিষ্ট খবরের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে তল্লাশি চালাচ্ছিল। তখনই এই মাওবাদী নেতা ধরা পড়েন। ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (ডিজিপি) নীরজ সিনহা বলেন, ‘কিষানদা বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ এবং ছত্তিশগড়ের অন্যতম শীর্ষ নকশাল নেতা ছিলেন। ১৯৬০-এর দশক থেকে তিনি নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। পুলিশ এখনও তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছে।’ তৎকালীন আইজি প্রশান্ত বোসের গ্রেফতারকে ‘সবচেয়ে বড় সাফল্য’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে খুনের পরিকল্পনা

নিষিদ্ধ সংগঠন সিপিআই (মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় কমিটি, পলিটব্যুরো এবং সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি। একাধিক রাজ্যে মাওবাদী কার্যকলাপ পরিচালনা করতেন। মূলত সারান্ডার জঙ্গলেই তাঁর ঘাঁটি ছিল বলে পুলিশ সূত্রের খবর। এলগার পরিষদ-কোরেগাঁও ভীমা মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন প্রশান্ত বোস। ২০১৮ সালে পুনে পুলিশ এই মামলা করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে খুনের পরিকল্পনা করার অভিযোগ ছিল এই মাওবাদী নেতার নামে। পুলিশ সূত্রে দাবি, ওই মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত রোনা উইলসনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রশান্ত বোসের বিরুদ্ধে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। পুনে পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত রোনা উইলসনের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া যোগাযোগ নথিতে “মোদি রাজ” শেষ করার পরিকল্পনার উল্লেখ ছিল, যা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের ধাঁচে সাজানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। ওই মামলায় অভিযোগ ওঠে, ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পুনেতে আয়োজিত এলগার পরিষদের বক্তৃতাগুলি উসকানিমূলক ছিল, যা পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি ভীমা কোরেগাঁওয়ে হিংসার জন্ম দেয়।

মাওবাদী সংগঠনের তাত্ত্বিক কাঠামোতে বড় শূন্যতা

প্রশান্ত বোসের মৃত্যুতে একদিকে যেমন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান হল, তেমনি মাওবাদী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ রণকৌশল ও তাত্ত্বিক কাঠামোতে বড়সড় শূন্যতা তৈরি হল বলে মনে করা হচ্ছে। হাই-প্রোফাইল এই বন্দির মৃত্যুর স্পর্শকাতরতা বিচার করে ইতিমধ্যেই একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে এবং ময়নাতদন্তসহ সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া কড়া নজরদারিতে সম্পন্ন করা হচ্ছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে মামলাটি জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)-র হাতে যায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনআইএ ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী কার্যকলাপ পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টার অভিযোগে প্রশান্ত বোসের বিরুদ্ধে আরও একটি চার্জশিট দাখিল করে। প্রশান্ত বোসের মৃত্যুতে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইস্যুতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share