মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC Update) অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবার পৌঁছল জাতীয় স্তরে। দলের প্রতীক ‘জোড়াফুল’ এবং দলীয় তহবিলের আসল মালিকানার দাবি নিয়ে বৃহস্পতিবার নতুন দিল্লিতে ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) সদর দফতরে দেখা করল তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধি দল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সহ কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠকে বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারাই ‘আসল তৃণমূল’ এবং এই সংক্রান্ত সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র ইতিমধ্যেই কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ঋতব্রত ছাড়াও প্রতিনিধিদলে রয়েছেন, সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান, আখরুজ্জামান, অরূপ রায়, শুভাশিস দাস, গোলাম রব্বানি-সহ ১০ জন।
‘আমি’ নয়, এখানে সবাই ‘আমরা’
গত ২২ জুন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ডাকা একটি বিশেষ অধিবেশনের পর থেকেই এই আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের সূত্রপাত। বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, “গত ২২ জুন অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর পরপরই আমরা লিখিতভাবে নির্বাচন কমিশনকে জানাই এবং কলকাতায় সশরীরে দেখা করি। আজ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনাররা আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে শুনেছেন। আমরা আমাদের যুক্তিগুলো তুলে ধরেছি এবং আশা করছি কমিশন খুব দ্রুত এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।” একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের দাবিকে উড়িয়ে দিয়ে তিনি কটাক্ষ করেন, “আমি কোনও দাবিতে যেতে চাই না। তবে ২৯১টি বিধানসভা কেন্দ্রেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ছিল, তা সত্ত্বেও তৃণমূল হেরেছে। বাংলার জনমত স্পষ্টভাবেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে গিয়েছে। দলটা আসলে একটা পারিবারিক পার্টিতে পরিণত হয়েছিল। তবে আমাদের এখানে কেউ ‘আমি’ নয়, এখানে সবাই ‘আমরা’।”
প্রতীক ও তহবিলের দখল নেওয়ার জন্য কমিশনের দরবারে
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পর তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৪ জনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের হাত ছেড়ে বেরিয়ে আসায় দলের অন্দরে সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি পরবর্তীতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানায় এবং একটি নতুন ৩০ সদস্যের জাতীয় কর্মসমিতি (NWC) ঘোষণা করে। নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের কাছে এই নতুন জাতীয় কর্মসমিতি গঠনের বিষয়টিও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। দলীয় প্রতীক ও তহবিলের নিয়ন্ত্রণ ঘিরেই মূল লড়াই—এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের ধারণা, ঋতব্রতরা মূলত কালীঘাট শিবিরের হাত থেকে দলের প্রতীক এবং তহবিলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চাইছেন। বিশেষ করে তাঁদের নির্বাচিত কোষাধ্যক্ষ আখরুজ্জামানের হাতে দলীয় তহবিলের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার দাবিই কমিশনের কাছে জানানো হয়ে থাকতে পারে।
তৃণমূল কংগ্রেস দলটি কার
আসলে তৃণমূল কংগ্রেস দলটি কার, সেটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাকি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে। আর এমন পরিস্থিতিতেই ঋতব্রতর নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের ১০ জন বিধায়কের একটি প্রতিনিধি দল আজ নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঋতব্রত জানান, তাঁরা কমিশনকে দাবি করেছেন যে তাঁরাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি, সংসদীয় দল, বিধায়ক দল, জেলার স্তরের অধিকাংশ সংগঠন তাঁদের সঙ্গেই রয়েছে। তারপর তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা খুব শীঘ্রই আমাদের দাবি এবং জমা দেওয়া নথিপত্র খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।’
তৃণমূলের দ্বৈরথে এখন সংকটে নির্বাচন কমিশন
হাত গুটিয়ে বসে নেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও। ঋতব্রতরা যখন জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি তৈরির তোড়জোড় করছিলেন, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ আলাদা একটি নতুন কমিটির তালিকা তৈরি করে নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়ে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যেখানে চেয়ারপার্সন হিসেবে নিজেই সই করেছেন নেত্রী। স্বাভাবিকভাবেই জোড়া কমিটির এই দ্বৈরথে এখন সংকটে নির্বাচন কমিশন। একই দলের সমান্তরাল দুটি দাবি জমা পড়ায় কমিশন শেষ পর্যন্ত কাকে ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, আর কার হাতে উঠবে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তুমুল জল্পনা। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, দলের রাশ কার হাতে থাকবে সেই লড়াই আগামী দিনে নির্বাচন কমিশনের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে।
রাজনৈতিক গুরুত্ব
২১ জুলাইয়ের শহিদ সমাবেশের আগে এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, যদি নির্বাচন কমিশন দলীয় প্রতীক ও সংগঠনের প্রশ্নে কোনও পদক্ষেপ নেয়, তবে তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি। সূত্রের খবর, ঋতব্রতপন্থীদের সঙ্গে কথা বলার পরে জাতীয় নির্বাচন কমিশন কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের প্রতিনিধিদেরও ডেকে পাঠিয়ে তাঁদের বক্তব্য জানতে চাইবে।

Leave a Reply