মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ইন্দোনেশিয়া সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (PM Modi visits Prambanan Temple) বুধবার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে যোগ্যাকার্তার ঐতিহাসিক প্রাম্বানান (Prambanan) মন্দির পরিদর্শন করেন। প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো এই বিশ্ববিখ্যাত হিন্দু মন্দির কমপ্লেক্সের সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার যৌথ প্রকল্পেরও সূচনা হয়। মন্দির পরিদর্শনের পর প্রধানমন্ত্রী মোদি সামাজিক মাধ্যম এক্স (X)-এ হেলিকপ্টার থেকে তোলা প্রাম্বানান মন্দিরের মনোরম আকাশপথের একটি ভিডিও শেয়ার করে লেখেন, “ম্যাজেস্টিক প্রাম্বানান মন্দির!” সফরের আগে তিনি প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে একটি ছবিও পোস্ট করেন। প্রধানমন্ত্রীর এদিন এই মন্দির দর্শনের সঙ্গে সঙ্গেই আরও একবার চর্চায় এসেছে বিভিন্ন দেশে ভারত সরকারের উদ্যোগে মন্দির পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ। প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বে গত এক দশকে প্রতিবেশী দেশ থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক ঐতিহাসিক মন্দির ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ভারত।
নবম শতকের স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হিসেবে বিবেচিত হয় ইন্দোনেশিয়া। যেখানে এমন এক সুপ্রাচীন শিব মন্দির রয়েছে যা ভারতের প্রাচীন সাংস্কৃতিক প্রভাবের স্বাক্ষ্য বহন করে। প্রায় ১,০০০ বছর পুরনো প্রম্বানন শিব মন্দির ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম হিন্দু মন্দির। জাভা দ্বীপের যোগ্যাকার্তার কাছে অবস্থিত প্রাম্বানান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক অন্যতম হিন্দু স্থাপত্য নিদর্শন। নবম শতকে নির্মিত এই মন্দিরসমূহ শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মার উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, একাধিক ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং একাদশ শতকে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে মন্দিরগুলির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ১৭শ শতকে এই স্থাপত্য পুনরাবিষ্কৃত হয়। ২০০৬ সালের জাভা ভূমিকম্পেও মন্দির কমপ্লেক্সের ক্ষতি হয়।
ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রাম্বানন মন্দিরটি নবম শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। ভগবান মহাদেবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত এই মন্দির চত্বরটি তার চমৎকার স্থাপত্য এবং জটিল কারুকার্যের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। মন্দিরের দেওয়ালে রামায়ণের কাহিনি খোদাই করা আছে। যা ভারতীয় সংস্কৃতি এবং ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ককে তুলে ধরে। প্রাম্বানান মন্দির কমপ্লেক্সে মোট ২৪০টি মন্দিরের কাঠামো রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান প্রাঙ্গণে রয়েছে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ৪৭ মিটার উঁচু শিব মন্দির, যার পাশে রয়েছে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মন্দির। ইউনেস্কো এই মন্দির কমপ্লেক্সকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের স্বীকৃতি দিয়েছে। মন্দিরের পাথরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে ইন্দোনেশীয় সংস্করণে রামায়ণের বিভিন্ন কাহিনি। প্রতি বছর মে থেকে অক্টোবর মাসের পূর্ণিমার রাতে মন্দিরের দক্ষিণ প্রান্তে খোলা মঞ্চে বিখ্যাত রামায়ণ ব্যালে মঞ্চস্থ হয়।
সংরক্ষণে ভারত-ইন্দোনেশিয়ার যৌথ উদ্যোগ
সফর চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী মোদি ঘোষণা করেন, প্রাম্বানান মন্দির কমপ্লেক্সের সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে ভারত ও ইন্দোনেশিয়া যৌথভাবে কাজ করবে। এই প্রকল্পে ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (ASI) ইন্দোনেশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অংশীদারিত্বে প্রাম্বানান কমপ্লেক্সের একাধিক ছোট মন্দিরের সংরক্ষণ ও পুনর্গঠনের কাজ করবে। এই উদ্যোগ দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক নতুন নয়। ঐতিহাসিকদের মতে, বহু শতাব্দী আগে ভারতীয় বণিক থেকে শুরু করে সাধু ও পণ্ডিতগণ সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁরা নিজেদের সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম এবং ঐতিহ্য নিয়ে এসেছিলেন। এই কারণেই আজও ইন্দোনেশিয়ায় রামায়ণ ও মহাভারত মঞ্চস্থ হয় এবং একাধিক জায়গায় হিন্দু সংস্কৃতির ঝলক দেখা যায়। ১৯৯১ সাল থেকে মন্দিরটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রম্বানন মন্দিরটি নবম শতাব্দীতে হিন্দু মাতারাম (মেদাং) সাম্রাজ্যের শাসক রাকাই পিকাতান নির্মাণ করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, মন্দিরটির নির্মাণকাজ আনুমানিক ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল।
প্রাম্বানন মন্দিরে পূজার্চনা মোদির
শুধু পরিদর্শন নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এদিন প্রাম্বানন মন্দিরে পূজার্চনাও করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী ও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট যৌথভাবে ‘প্রাম্বানন মন্দিরের জন্য ভারত-ইন্দোনেশিয়া যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ’ প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করেন। এই উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা আমার সৌভাগ্য যে, আমি সর্বদা ভগবান শিবের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পাই। আমার জন্ম হয়েছিল ভাদনগরে, যেখানে হাতকেশ্বর মহাদেব বিরাজমান। সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ হলো প্রথম জ্যোতির্লিঙ্গ এবং এটি গুজরাটে অবস্থিত; এর উন্নয়নের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব আমার ওপর ন্যস্ত। আমার নির্বাচনী এলাকা কাশী (বারাণসী)-তে রয়েছে কাশী বিশ্বনাথ মহাদেব, যাঁর আশীর্বাদ আমি সর্বদা পেয়েছি। কেদারনাথ বা উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরের পুনর্নির্মাণই হোক কিংবা এখানে আমার আগমন-এই সব ক্ষেত্রেই সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ শুরু করার সুযোগ আমি পেয়েছি। আমি একে পরম সৌভাগ্য বলে মনে করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আমার সফরের আজ তৃতীয় দিন, কিন্তু এখানকার জীবনযাত্রা, কথাবার্তা ও বাতাসে সংস্কৃতির এক সুবাস পাওয়া যাচ্ছে-এমন এক সুবাস যা আমরা ভারতে প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করি। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই সুবাসই আমাদের একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এখানকার মানুষ যেভাবে এই ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করেছেন, তার জন্য আমি তাঁদের ধন্যবাদ জানাই। তাই, ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক এবং এ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী সকল শাসককে আমি এর জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

Leave a Reply