মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ২০২৬, তৃণমূল শাসিত পশ্চিমবঙ্গে ভোটপ্রচারের মঞ্চ থেকেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) বলেছিলেন, ‘‘বিকাশ ভি হোগা, হিসাব ভি হোগা।’’ অর্থাৎ উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতিরও হিসাব নেওয়া হবে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই বার্তারই প্রতিফলন যেন দেখা গেল বিধানসভায় (WB Assembly)। স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেটের জবাবি ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ক্যাগ রিপোর্টে (CAG Report) যাঁদের নাম উঠবে, তিনি যত বড় নেতা-মন্ত্রীই হোন না কেন, আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে রাজ্যপালের কাছে এফআইআর করার সুপারিশও করা হবে।
কী বললেন মুখ্যমন্ত্রী (Suvendu Adhikari)?
বিধানসভায় (WB Assembly) দাঁড়িয়ে এদিন শুভেন্দু অধিকারী বললেন, ‘‘আগামী ২৫ জুলাই ক্যাগ রিপোর্ট (CAG Report) পেশ হবে। পরবর্তী অধিবেশনে আমরা ক্যাগ রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করব এবং তার সুপারিশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেব। যেখানে যেখানে দুর্নীতি হয়েছে, ক্যাগ তা ধরবে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হোন, মন্ত্রী হোন কিংবা যত বড় নেতাই হোন না কেন। তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করার জন্য আমরা রাজ্যপালের কাছে সুপারিশ করব।’’ এদিকে মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যে স্পষ্ট যে, দুর্নীতির অভিযোগে ব্যক্তি নয়, প্রমাণই হবে সরকারের পদক্ষেপের ভিত্তি।
ফের সামনে আমফান দুর্নীতির প্রসঙ্গ
এদিন মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এল ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আমফানের পর ত্রাণ বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গও। তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজি (Narendra Modi) আমফানের সময় দু’দফায় ৩ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু আমফানে বড় দুর্নীতি হয়েছিল। কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা হয়। সেই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ ক্যাগ তদন্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হয়নি, বিধানসভাতেও (WB Assembly) পেশ করা হয়নি। যাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধেও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।’’ সেই বিশেষ ক্যাগ তদন্তের রিপোর্টও এবার প্রকাশ্যে এনে বিধানসভায় আলোচনা করা হবে বলেও জানান শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adjikari)।
বিশেষ অধিবেশনের ইঙ্গিত
এদিন অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি (UCC) নিয়েও মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান,”সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির কাজ শেষ হলেই রিপোর্ট জমা পড়বে। এরপর রাজ্যপালের কাছে বিশেষ অধিবেশন ডাকার সুপারিশ করা হবে। যাতে আমফানের বিশেষ ক্যাগ রিপোর্ট-সহ ক্যাগ রিপোর্ট নিয়ে এই বিধানসভায় আলোচনা হয়। যারা বড় বড় ভাষণ দিয়েছেন, এবার তাঁদের মুখোশও খোলা হবে। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
১ অগাস্ট থেকে সচল হবে সাংবিধানিক কমিশনগুলি
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari)। তিনি বলেন, ‘‘আগের সরকার মানবাধিকার কমিশন, মহিলা কমিশন, শিশু রক্ষা কমিশন, এসসি-এসটি, ওবিসি, সংখ্যালঘু কমিশন এবং তথ্য কমিশনার-সহ একাধিক সাংবিধানিক সংস্থাকে কার্যত অচল করে রেখেছিল। পশ্চিমবঙ্গে যতগুলি সাংবিধানিক সংস্থা আছে, সবকটিকেই অচল করে রাখা হয়েছিল। আগামী ১ অগাস্ট থেকে সব কমিশন আবার কাজ শুরু করবে। তারা সব অভিযোগ নিতে বাধ্য থাকবে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও করবে।’’ একইসঙ্গে প্রাক্তন বিচারপতি তথা পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অশোক গাঙ্গুলির উপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আগের সরকারের আমলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়নি।
কুণাল ঘোষের পাল্টা প্রশ্ন
তবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছে তৃণমূলও। কালীঘাটের তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের (Kunal Ghosh) পাল্টা প্রশ্ন, ক্যাগ রিপোর্টে যদি বালিশ শিবিরের কারও নাম থাকে, সেখানেও কি ব্যবস্থা হবে? এর আগেও একটা ঘটনায় এক বিধায়কের সই দেখিয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল। তারপর কী হয়েছিল?
‘জিরো টলারেন্স’-এর বার্তা, এখন নজর ক্যাগ রিপোর্টে
বিজেপি সরকার শুরু থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে এগোচ্ছে। ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন মামলায় পদক্ষেপ কার্যত সেই বার্তাই দিয়েছে। এবার ২৫ জুলাই ক্যাগ রিপোর্ট প্রকাশের পর তাতে উঠে আসা পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়? আমফান দুর্নীতির বিশেষ তদন্তের রিপোর্ট কবে বিধানসভায় আসে? অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়? এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। কারণ, এই রিপোর্টকে ঘিরেই বাংলার রাজনীতিতে যে নতুন সংঘাতের সূচনা হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Reply