PM Modi in Uzbekistan: ইউরেনিয়াম আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সই! প্রধানমন্ত্রী মোদিকে উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদান

pm modi in uzbekistan india secures long-term uranium supply deal

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির (PM Modi in Uzbekistan) দু’দিনের উজবেকিস্তান সফরের শেষে ভারত ও উজবেকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। রবিবার (৩০ আগস্ট) তাশখন্দে উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিয়োয়েভের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দেশ নিজেদের সম্পর্ককে ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ (Comprehensive Strategic Partnership)-এ উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের অসামরিক পরমাণু কর্মসূচির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহের (Uranium Supply Deal) ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে। প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়েও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহে জোর

মোদির সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ইউরেনিয়াম সরবরাহ। ভারতের অসামরিক পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরবরাহের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করতে উজবেকিস্তানের সঙ্গে এই সমঝোতা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, “আমরা ইউরেনিয়াম সরবরাহের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করব।” এই ব্যবস্থার বিস্তারিত শর্ত ও সরবরাহের কাঠামো আগামী দিনে দুই দেশ চূড়ান্ত করবে। পরমাণু শক্তির পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহ নিশ্চিত হলে ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনাকে তা আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যৌথ উৎপাদন ও গবেষণায় জোর

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। মোদি জানান, আগামী দিনে দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ, যৌথ উৎপাদন এবং যৌথ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, দুই দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা পারস্পরিক আস্থার প্রতিফলন লক্ষ্য করা গিয়েছে। সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছে ভারত ও উজবেকিস্তান। দুই দেশই এই সমস্যাগুলিকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে জোর দিয়েছে। মধ্য এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উজবেকিস্তানের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোদি দেশটিকে মধ্য এশিয়ার ‘হৃদয়স্থলে’ অবস্থিত বলে উল্লেখ করেন।

২০৩০-এর মধ্যে বাণিজ্য ৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য

অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে দুই দেশ। উজবেক প্রেসিডেন্ট মির্জিয়োয়েভ জানান, ভারত-উজবেকিস্তান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রথমবারের মতো ১ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পেরিয়েছে। এবার ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা, ব্যাংকিং ও পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ করা এবং নতুন পরিকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে একটি যৌথ বিজনেস সামিটও আয়োজন করা হবে। মির্জিয়োয়েভ জানান, ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে যৌথ উদ্যোগের সংখ্যা গত কয়েক বছরে প্রায় সাত গুণ বেড়েছে। দুই দেশের মধ্যে বিমান যোগাযোগও বেড়েছে—বর্তমানে সপ্তাহে ১৪টি সরাসরি বিমান চলাচল করছে।

এআই, ডিজিটাল প্রযুক্তি, মহাকাশ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজেও সহযোগিতা

নতুন অংশীদারিত্বের আওতায় ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, মহাকাশ এবং পরমাণু শক্তির মতো ভবিষ্যৎমুখী ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন মোদি। দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে শুধু ঐতিহ্যগত কূটনীতি বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে।

‘সিস্টার সিটি’ চুক্তি, নজরে নিউ তাশখন্দ ও গুজরাট

ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে তিনটি ‘সিস্টার সিটি’ এবং ‘সিস্টার স্টেট’ চুক্তি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মোদি বলেন, এই ধরনের চুক্তি যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, তার জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা প্রয়োজন। উজবেকিস্তানের নতুন নগর প্রকল্প নিউ তাশখন্দ নিয়েও আলোচনা হয়। এই প্রকল্পের পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুজরাটের গিফ্ট সিটি-র অভিজ্ঞতা উজবেকিস্তানের কাজে আসতে পারে বলে জানান মোদি। উজবেকিস্তানের একটি প্রতিনিধিদলকে গুজরাটে আমন্ত্রণ জানিয়েগিফ্ট সিটি-র উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা সরেজমিনে দেখার প্রস্তাবও দেন প্রধানমন্ত্রী।

সাংস্কৃতিক সম্পর্কেও বাড়ছে ঘনিষ্ঠতা

দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করার ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। মোদি বলেন, ভারত ও উজবেকিস্তানের উন্নয়নের লক্ষ্যগুলির মধ্যে যথেষ্ট মিল রয়েছে। ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ এবং ‘নিউ উজবেকিস্তান’-এর লক্ষ্যগুলির মধ্যে যুবসমাজ, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে মিল রয়েছে। উজবেকিস্তানে ভারতীয় সংস্কৃতির জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। তাশখন্দের লাল বাহাদুর শাস্ত্রী সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান কালচার এবং মহাত্মা গান্ধী সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান স্টাডিজ দুই দেশের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উজবেকিস্তানে যোগচর্চার জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। ২০১৮ সাল থেকে সেখানে জাতীয় যোগ ফেডারেশন রয়েছে এবং চলতি বছরের জুনে একটি আঞ্চলিক যোগ উৎসবও আয়োজন করা হয়।

মোদিকে উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান

সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ওলি দরাজলি দোস্তলিক’-এ ভূষিত করা হয়। এই সম্মান (Order of Oliy Darajali Do‘stlik’) প্রদান করেন প্রেসিডেন্ট মির্জিয়োয়েভ। ভারত-উজবেকিস্তান সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে মোদির অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান দেওয়া হয়। এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রাপ্ত ৩৬তম আন্তর্জাতিক পুরস্কার। সম্মান গ্রহণ করে মোদি বলেন, এই পুরস্কার দুই দেশের বন্ধুত্ব এবং ভারত ও উজবেকিস্তানের জনগণের উদ্দেশে উৎসর্গ করছেন। ‘দোস্তলিক’ শব্দের অর্থ বন্ধুত্ব—উল্লেখ করে মোদি বলেন, এই শব্দটিই দুই দেশের সম্পর্কের মূল চেতনাকে তুলে ধরে।

মধ্য এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত পদক্ষেপ আরও জোরদার

দু’দিনের সফর শেষে ভারত ও উজবেকিস্তান প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ-সহ একাধিক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি করেছে। দুই দেশের সম্পর্ককে ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ (Comprehensive Strategic Partnership)-এ উন্নীত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহের উদ্যোগ ভারতের পরমাণু ও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি মোদির চতুর্থ উজবেকিস্তান সফর। মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই সফরকে দেখা হচ্ছে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share