মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল কিনলে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ধার্য করতে পারবে আমেরিকা। বুধবার এমনই বিল পাশ হয়েছে মার্কিন আইনসভায়। রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার বিল মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে পাস হওয়ার পরই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল ভারত। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে আমদানি চালিয়ে যাবে ভারত। পাশাপাশি, পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ করা হবে। বৃহস্পতিবার বিদেশ মন্ত্রকের (MEA) পক্ষ থেকে জানানো হয়, মার্কিন কংগ্রেসে বিলটি পাস হওয়ার বিষয়টি ভারত নোট করেছে এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের উপর নজর রাখা হচ্ছে।
কী রয়েছে মার্কিন বিলে
‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংকসানিং রাশিয়া ও ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬’ (Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026) নামে বিলটি বুধবার মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হয়েছে। এর আগে গত ৭ আগস্ট মার্কিন সেনেটে ৮৬-১১ ভোটে বিলটি অনুমোদিত হয়েছিল। এবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে বিলটি। বিলটিতে রাশিয়ার নেতৃত্ব ও জ্বালানি খাতের উপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার পাশাপাশি, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ থাকা জাহাজগুলির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় ক্রেতা—ভারত ও চিনের মতো দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছে।
বিদেশমন্ত্রকের বিবৃতি
বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “১৪০ কোটি ভারতীয়ের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে ভারত সরকার সম্পূর্ণরূপে অঙ্গীকারবদ্ধ।” ওই বিবৃতিতে একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, “আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অপরিশোধিত তেল ও শক্তি সম্পদ ক্রয় অব্যাহত রাখবে ভারত।” এই বিবৃতি থেকেই স্পষ্ট যে, ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর ছাড়পত্রকে হাতিয়ার করে ট্রাম্প প্রশাসন চাপ তৈরি করলে বা দর কষাকষির পথে হাঁটলে তাতে নতিস্বীকার করবে না ভারত। বরং নিজস্ব প্রয়োজন অনুসারে রাশিয়া এবং অন্যান্য তেল আমদানিকারক দেশ থেকে জ্বালানিপণ্য কেনা অব্যাহত রাখবে। নতুন এই মার্কিন আইনের ফলে যদি ভারতের রফতানি বাণিজ্য বা জ্বালানি আমদানিতে কোনও প্রভাব পড়ে, তবে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ করার কথাও জানানো হয়েছে মন্ত্রকের বিবৃতিতে। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, উদ্ভূত এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দেশীয় বাণিজ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভারতীয় বাণিজ্য ও শিল্প সংস্থাগুলির সঙ্গে সরকার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে যৌথ ভাবে কাজ করবে।
আগে থেকেই সতর্ক বিদেশমন্ত্রক
নয়াদিল্লির তরফে বলা হয়েছে, বিল পাসের বিষয়টির উপর সরকার নজর রাখছে। বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে লেখা হয়েছে, বিলটি আইনসভায় পাস করানোর আগেই এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে মার্কিন আধিকারিকদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করা হয়েছিল। সেখানে নয়াদিল্লির তরফে স্পষ্ট করে দেওয়া হয় যে, রাশিয়া থেকে তেল বা গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে আমেরিকা কোনও ধরনের শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে, তা কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না, একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারেও চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। আমেরিকার প্রাক্তন রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামাঙ্কিত এই বিল (লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬) গত মাসেই মার্কিন আইনসভার উচ্চকক্ষ সেনেটে পাস করানো হয়েছিল। বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ৮৬ জন। আর বিপক্ষে ১১ জন। বুধবার এই বিল পেশ করা হয় নিম্নকক্ষে। সেখানে বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ২৬২টি। আর বিপক্ষে ১৫৯টি। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির অধিকাংশ সদস্য তো বটেই, বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বেশ কয়েক জনও বিলের পক্ষে ভোট দেন।
ভারত-মার্কিন-চিন-রাশিয়া সম্পর্কে প্রভাব
রাশিয়ার উপর চাপ বাড়ানো এবং মস্কোর জ্বালানি রফতানি থেকে অন্যান্য দেশের নির্ভরতা কমানোই এই বিলের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে বিলটিতে ইরানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে। বিলটি পাস হওয়ার পর মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল বলেন, “চিন ও ভারত, তোমরা বরং অন্য কোথাও থেকে তেল ও গ্যাস কিনো।” উল্লেখযোগ্যভাবে, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নির্ধারিত মার্কিন সফরের কয়েক দিন আগেই মার্কিন কংগ্রেসে এই বিল পাস হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি ভারত-মার্কিন ও চিন-মার্কিন সম্পর্কেও এই পদক্ষেপের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন বিলের বিরোধিতা চিন-রাশিয়ার
এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনায় সরব চিন, রাশিয়ার মতো দেশ। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দেশ সাফ জানিয়েছেন, রাশিয়া ও ইরানের তেল কেনায় নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিল একেবারেই বন্ধুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নয়। মার্কিন প্রশাসন এনিয়ে আরও বাড়াবাড়ি করলে ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তি চুক্তি ব্যাহত হতে পারে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকোভ জানিয়েছেন, নয়া বিলের উপর কড়া নজর রাখছে রুশ প্রশাসন। আমেরিকার পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ চিনও। বেজিং জানিয়েছে, চিন সবসময় বাণিজ্যিক ও আর্থিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থ ও সাম্য বজায় রাখার পক্ষপাতি। তাতে তৃতীয় কোনো দেশের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। এব্যাপারে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জিউ জাইকুন জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন উড়িয়ে ও রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া তৃতীয় দেশের বিষয়ে নাক গলানোর বরাবর বিরোধিতা করেছে চিন।

Leave a Reply