France Protests: ফ্রান্সে হিংসাত্মক বিক্ষোভ, ভারতীয়দের জন্য দূতাবাসের সতর্কবার্তা! প্যারিস-সহ একাধিক শহরে কার্ফু

france-violent-protests-indian-embassy-advisory-indian-nationals-safety-alert

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সরকারি পরিষেবার অবনতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার একাধিক সমস্যা ঘিরে উত্তপ্ত ফ্রান্স। রাজধানী প্যারিস-সহ মার্সেই ও লিয়ঁর মতো শহরে বিক্ষোভ ঘিরে হিংসা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা সামনে এসেছে। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ফ্রান্সে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিক এবং দেশটিতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, এমন ভারতীয়দের জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে প্যারিসে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস। বিক্ষোভের এলাকা এড়িয়ে চলা, জনবহুল স্থানে না যাওয়া এবং ফরাসি প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ভারতীয় দূতাবাসের পরামর্শ, কী জানানো হয়েছে?

বুধবার সন্ধ্যায় জারি করা পরামর্শে ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, ফ্রান্সের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় স্তরে কার্ফু জারির বিষয়টি বিবেচনা করে ভারতীয় নাগরিকদের সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে যেকোনও ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজনীয় সাবধানতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দূতাবাসের তরফে আরও বলা হয়েছে, যেখানে বিক্ষোভ চলছে, সেই এলাকাগুলি থেকে দূরে থাকতে হবে। ফরাসি প্রশাসন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যে নির্দেশিকা জারি করছে, তা যথাযথভাবে মেনে চলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

বিক্ষোভের কারণে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে পরিবহণ পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে। তাই যাতায়াতের পরিকল্পনা করার আগে সরকারি সূত্র থেকে সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে নেওয়ার কথা বলেছে দূতাবাস। বিশেষ করে পর্যটক, পড়ুয়া, কর্মসূত্রে ফ্রান্সে থাকা ভারতীয় এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এই সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ।

জরুরি প্রয়োজনে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর ও ইমেল:

  • ● ফোন: +33 6 48 34 00 63

  • ● ইমেল: cons.paris@mea.gov.in

কেন অশান্ত ফ্রান্স? ক্ষোভের কেন্দ্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষা

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক অশান্তির পিছনে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবার অবনতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। সেই অসন্তোষ থেকেই শুরু হওয়া বিক্ষোভের একাংশ হিংসাত্মক রূপ নিয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে।

প্যারিস, মার্সেই ও লিয়ঁর মতো শহরে বিক্ষোভ চলাকালীন লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর সামনে এসেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হয়েছে। কয়েকটি বড় শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় এখনও কার্ফু জারি রয়েছে।

এই অশান্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভ। স্কুলগুলিতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব, পরিকাঠামোর দুর্বলতা এবং শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মীর ঘাটতি নিয়ে অভিযোগ তুলেছে পড়ুয়াদের একাংশ। বিশেষত আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলির স্কুলে এই সমস্যাগুলি বেশি প্রকট বলে দাবি উঠেছে।

পাশাপাশি, দীর্ঘক্ষণ স্কুলে থাকতে হওয়া নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে পড়ুয়াদের মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত স্কুলের সময়সূচি ক্লান্তিকর হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতির জটিলতা এবং সেই ব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

অর্থাৎ, এই বিক্ষোভ শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। এর পিছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি পরিষেবার মান এবং শিক্ষার সুযোগ নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষও।

দু’রাত শান্তি, তবুও কাটেনি উদ্বেগ

সপ্তাহান্তে অশান্তির পর পরপর দু’রাত ফ্রান্সে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। তবে তাতে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। একাধিক বড় শহরের কিছু অংশে কার্ফু এখনও বহাল রয়েছে। নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দেওয়ায় পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার ও শনিবার আরও বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ছাত্র সংগঠনগুলির পাশাপাশি ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ফ্রান্সে বড়সড় আন্দোলনের জন্ম দেওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলির তরফেও বিক্ষোভের ডাক এসেছে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ঘিরে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছিল। সেই আন্দোলনের স্মৃতি এখনও ফরাসি প্রশাসনের কাছে উদ্বেগের কারণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে বড় জমায়েত হলে অশান্তি আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা, শনিবার বড় নিরাপত্তা অভিযান

প্যারিসে বৃহস্পতিবারের জন্য পরিকল্পিত একটি বিক্ষোভ কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হবে না বলে বুধবার জানিয়েছে শহরের পুলিশ। জননিরাপত্তার ঝুঁকি এবং সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন জানিয়েছেন, বিক্ষোভ চলাকালীন এবং তার পরে আটক হওয়া ২,৫০০ জনের মধ্যে ১৭৪ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরও ৯১৭ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। শনিবার ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান চালানো হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। বিক্ষোভের আড়ালে ছোট ছোট দুষ্কৃতী গোষ্ঠীর হিংসাত্মক কার্যকলাপ যাতে ফের বড় আকার না নেয়, তা নিশ্চিত করাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য।

প্রশাসনের আশঙ্কা, অল্প কয়েকটি গোষ্ঠীর হিংসাত্মক কার্যকলাপও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা সামনে এসেছে বলেও মনে করা হচ্ছে।

ইতালিতেও ভারতীয়দের জন্য সতর্কবার্তা

ফ্রান্সের আগে চলতি সপ্তাহেই ইতালিতে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরামর্শ জারি করেছিল সেখানকার ভারতীয় দূতাবাস। ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে ওই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

সেখানেও ভারতীয় নাগরিকদের জনবহুল এলাকা এবং বিক্ষোভস্থল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজ রাখার কথা বলা হয়।

ফ্রান্স ও ইতালি—দুই দেশেই বিক্ষোভের জেরে ভারতীয় দূতাবাসগুলির এই সতর্কবার্তা বিদেশে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

ফ্রান্সে যাওয়া ভারতীয়দের কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন?

বর্তমান পরিস্থিতিতে ফ্রান্সে বসবাসকারী ভারতীয়দের পাশাপাশি পর্যটক ও পড়ুয়াদেরও কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

  • ● বিক্ষোভস্থল এড়িয়ে চলুন: মিছিল, জমায়েত বা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে, এমন এলাকায় যাবেন না।

  • ● কার্ফুর নিয়ম মানুন: স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী চলাফেরা করুন।

  • ● যাতায়াতের খবর রাখুন: ট্রেন, বাস এবং অন্যান্য পরিবহণ পরিষেবার সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে সরকারি সূত্র থেকে জেনে নিন।

  • ● সরকারি নির্দেশিকা অনুসরণ করুন: স্থানীয় প্রশাসন ও ভারতীয় দূতাবাসের নতুন বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর রাখুন।

  • ● জরুরি যোগাযোগের তথ্য সঙ্গে রাখুন: প্রয়োজন হলে দ্রুত ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

সব মিলিয়ে, ফ্রান্সে আপাতত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও নতুন করে বিক্ষোভের ডাক এবং কয়েকটি শহরে কার্ফু বহাল থাকায় উদ্বেগ রয়ে গিয়েছে। আগামী কয়েক দিনে প্রশাসন পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তার উপরই নির্ভর করছে অশান্তি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে। ফ্রান্সে থাকা ভারতীয়দের ক্ষেত্রে তাই আপাতত সতর্কতা, সরকারি নির্দেশ মেনে চলা এবং পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজ রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share