Gwalior Madrasa Raid: গ্বালিয়রের মাদ্রাসায় অনিয়মের অভিযোগ, ২৬ শিশু উদ্ধার, তালা ঝোলাল  প্রশাসন

gwalior-madrasa-raid-8-girls-rescued-locked-room

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ধর্মীয় শিক্ষার নামে পরিচালিত একটি মাদ্রাসায় শিশুদের আবাসন, পড়াশোনা, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক গুরুতর অনিয়মের (Gwalior Madrasa Raid) অভিযোগ উঠল। মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রের ঝাঁসি রোডে অবস্থিত দার-উল-কোরান মাদ্রাসায় পরিদর্শন চালিয়ে একাধিক অসংগতি সামনে এনেছে প্রশাসন। শুক্রবারের ওই পরিদর্শনে উদ্ধার করা হয়েছে সাত থেকে ১৩ বছর বয়সি ১৮ বালক এবং চার থেকে ১৩ বছর বয়সি আট বালিকাকে (Girls Rescued)। গভীর রাতে মহকুমা শাসক অতুল সিং, ঝাঁসি রোডের নগর পুলিশ আধিকারিক এবং জেলা শিক্ষা আধিকারিকের উপস্থিতিতে মাদ্রাসাটি সিল করে দেওয়া হয়। শিশুদের শিশু কল্যাণ কমিটির তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন, শিক্ষা দফতর, নারী ও শিশু উন্নয়ন দফতর এবং শিশু কল্যাণ কমিটির যৌথ দল মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করে। কমিশনের চেয়ারপার্সন চিকিৎসক নিবেদিতা শর্মার নেতৃত্বে এই অভিযান চলে। শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা, আবাসনের ব্যবস্থা, পড়াশোনা, কর্মীদের উপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সংক্রান্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখেন আধিকারিকেরা।

দু’টি ঘরে বহু শিশু, শৌচাগারে দরজা নেই (Gwalior Madrasa Raid)

পরিদর্শনে শিশুদের থাকার পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছিল তাদের। মেঝেতে চাদর পেতে রাত কাটানোর ব্যবস্থা ছিল। রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতাও সন্তোষজনক ছিল না। শৌচাগারগুলিতেও দরজা ছিল না। শিশুদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, স্বাস্থ্যবিধি এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবও নজরে এসেছে তদন্তকারীদের। পরিস্থিতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন কমিশনের চেয়ারপার্সন নিবেদিতা শর্মা। তাঁর কথায়, “এভাবে শিশুদের শৈশব কেড়ে নেওয়া যায় না। আপনারা প্রতিষ্ঠান চালাতে পারেন, কিন্তু প্রত্যেককে নিয়ম মানতেই হবে।”

তিনি আরও জানান, সরকারি কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই মাদ্রাসাটিকে আবাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। শিশুরা সেখানে সারাদিন থাকলেও, তারা বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ভর্তি বলে দেখানো হয়েছে। অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত না থেকেও তাদের উত্তীর্ণ করানোর ব্যবস্থা চলছিল। কয়েক জন বালিকাকে আদৌ বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়নি বলেও অভিযোগ সামনে এসেছে। কমিশনের চেয়ারপার্সনের বক্তব্য, পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা না থাকা এবং মাত্র দু’টি ঘরে এত শিশুকে রাখা তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতার শামিল। কয়েক জন শিশু নিজেরাই জানিয়েছে, তারা সেখানে থাকতে চায় না এবং তাদের মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে।

মসজিদের কুঠুরিতে আট বালিকা

পরিদর্শনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল বালিকাদের থাকার ব্যবস্থা। মসজিদের পিছনে এক কোণে ছোট একটি ঘরে আট বালিকাকে পাওয়া গিয়েছে। সেখানে পৌঁছতে চারটি দরজা পেরোতে হয়। বালিকাদের দেখাশোনার জন্য এক জন শিক্ষিকা প্রতিদিন প্রায় দু’ঘণ্টার জন্য আসতেন বলে জানা গিয়েছে। ঘরটিতে ঘুমোনোর জন্য কেবল চাদরের ব্যবস্থা ছিল। নিরাপত্তার জন্য লাগানো নজরদারি ক্যামেরাগুলিও বন্ধ ছিল। ফলে বালিকাদের নিরাপদ আবাসন, নিয়মিত তত্ত্বাবধান এবং মহিলা কর্মীর পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জরুরি পরিস্থিতিতে শিশুদের সাহায্য পাওয়ার ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানে বাইরের লোকজনের প্রবেশের উপর কীভাবে নজর রাখা হয়, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নথিতে গরমিল!

মাদ্রাসার নথিতে ৪২ বালক এবং ১৫ বালিকার নাম রয়েছে। অর্থাৎ, নথি অনুযায়ী মোট পড়ুয়ার সংখ্যা ৫৭। অথচ পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিল মাত্রই ২৬ শিশু। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দাবি, শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় অনেক শিশু বাড়ি চলে গিয়েছিল। তবে নথিভুক্ত সংখ্যা ও বাস্তবে উপস্থিত শিশুদের সংখ্যার মধ্যে এত বড় ব্যবধান কেন, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী দল। পরিদর্শনের সময় শিশুদের ভর্তি সংক্রান্ত নথি, উপস্থিতির খাতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সংক্রান্ত কাগজপত্র নিজেদের হেফাজতে নেন আধিকারিকেরা। নথিতে থাকা বাকি শিশুরা কোথায় থাকে, কীসের ভিত্তিতে তাদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানে শিশুদের আসা-যাওয়ার হিসাব কীভাবে রাখা হয়, তাও জানার চেষ্টা চলছে (Girls Rescued)। অভিযোগ, মাদ্রাসায় বালিকা থাকার বিষয়টিও আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল। পরিদর্শনকারী দলকে প্রথমে কয়েক জন জানিয়েছিলেন, সেখানে কোনও বালিকা নেই। কিন্তু পরে তল্লাশির সময় একটি ঘরে আট বালিকাকে পাওয়া যায় (Gwalior Madrasa Raid)।

দুই বালিকার অভিযোগে বাড়ল উদ্বেগ

পরিদর্শনের সময় কমিশনের সদস্যরা শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। দুই বালিকা জানায়, তারা মাদ্রাসায় থাকতে চায় না এবং তাদের মারধর করা হয়েছে। তারা আরও কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ করেছে। শিশুদের নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনা করে অভিযোগগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

এর পর শিশুদের শিশু কল্যাণ কমিটির তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। তদন্তকারীদের মতে, কোনও আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিশুদের রাখা হলে তাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

নিবন্ধন ও স্বীকৃতির নথি নিয়ে প্রশ্ন

পরিদর্শনের সময় মাদ্রাসা পরিচালনাকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও সরকারি স্বীকৃতি সংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়। যদিও, প্রয়োজনীয় নথি দেখানো যায়নি বলে অভিযোগ। সেখানে শিশুদের কোরান পড়ানো হয় বলে জানা গিয়েছে। সাধারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষা কতটা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় এসেছে।

মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মহম্মদ সাবিরের দাবি, ৩৫ থেকে ৩৬ বছর ধরে ওয়াকফ বোর্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, সেখানে প্রায় ৪০ বালক এবং ১৪ থেকে ১৫ বালিকা পড়াশোনা করে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি হিন্দি, ইংরেজি ও উর্দুও পড়ানো হয় (Gwalior Madrasa Raid)।

বিদ্যালয়ে ভর্তি থাকলেও নিয়মিত পড়াশোনা নিয়ে সংশয়

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কিছু শিশুর নাম বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত থাকলেও, তারা নিয়মিত ক্লাসে যায় না বলে অভিযোগ। বিদ্যালয়ের নথিতে তাদের উপস্থিতি দেখানো হয় এবং সরাসরি পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ।

বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শিক্ষা দফতরকে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলির বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন কমিশনের চেয়ারপার্সন। উপস্থিতির নথিতে জালিয়াতির প্রমাণ মিললে বিষয়টি শুধু মাদ্রাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হতে পারে।

শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করার মূল উদ্দেশ্য নিয়মিত ও যথাযথ শিক্ষা নিশ্চিত করা। সেই উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে কি না, তা-ই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ধর্মীয় বইয়ের বিষয়বস্তুও খতিয়ে দেখা হচ্ছে

মাদ্রাসায় শিশুদের কাছ থেকে মাসে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে জানা গিয়েছে। পরিদর্শনের সময় একটি ঘরে রাখা বইপত্র পরীক্ষা করেন কমিশনের চেয়ারপার্সন। সেখান থেকে কয়েকটি হিন্দি ও উর্দু বই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, কয়েকটি হিন্দি বইয়ে হিন্দুধর্ম, ইহুদিধর্ম ও খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে বক্তব্য রয়েছে। তবে বইগুলিতে ঠিক কী লেখা রয়েছে এবং শিশুদের কী ধরনের বিষয়বস্তু পড়ানো হচ্ছে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় (Gwalior Madrasa Raid)।

মাদ্রাসা সিল করাই শেষ পদক্ষেপ নয়

দার-উল-কোরান মাদ্রাসা সিল করার ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। কোনও ধর্মীয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের রাখার ক্ষেত্রে নিরাপদ আবাসন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সম্মানজনক আচরণ (Girls Rescued) এবং নিয়মিত শিক্ষার নিশ্চয়তা থাকা জরুরি।

পরিদর্শনে উঠে আসা অনিয়ম এবং শিশুদের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দায়ীদের চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে মাদ্রাসা সিল করা হলেও, এর পর প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা যাচাই এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা। শিশুদের ভবিষ্যৎ যাতে কোনওভাবেই অনিশ্চয়তার মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব (Gwalior Madrasa Raid)।

 

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share