মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা। যুদ্ধ আবহ। জ্বালানি সংকটের মধ্যে ফের পাশে থাকার বার্তা দিল বন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়া (India Russia Relation)। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করলেন রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেনিস মানতুরোভ। জানা গিয়েছে, বর্তমান সঙ্কটে ভারতকে আরও বেশি করে খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো। পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েল ও ইরানের সংঘাতের জেরে বর্তমানে ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে পণ্য আনা কার্যত বন্ধ। এর ফলে ভারত জ্বালানি ও সার আমদানিতে বিপুল সমস্যায় পড়ছে৷ ঠিক এই সময়েই ফের এগিয়ে এল রাশিয়া।
ভারতকে আরও তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ
মোদি ও মানতুরোভের বৈঠকে মূলত বাণিজ্য, সংযোগ রক্ষা এবং প্রযুক্তির আদানপ্রদান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। পরে প্রধানমন্ত্রী মোদি সমাজমাধ্যমে জানান, গত বছর ডিসেম্বরে পুতিনের সফরের সময় যে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে দুই দেশই সফল। ২০২৫ সালের শেষে ভারতে সারের জোগানও ৪০ শতাংশ বাড়ান হয়েছে। চাষিদের জন্য প্রয়োজনীয় কার্বামাইড তৈরির লক্ষ্যে ভারত ও রাশিয়া দুই দেশ যৌথ ভাবে একটি প্রকল্প গড়ার কাজও শুরু করেছে। যুদ্ধ আবহে ভারতকে আরও তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের কথা বলেছে পুতিন-প্রশাসন। রুশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতকে তেল ও গ্যাস জোগাতে রাশিয়ার সংস্থাগুলি পুরোপুরি তৈরি।
ভারতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল
কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না। একে অপরকে শুধু হুমকিই নয়, হামলা-পাল্টা হামলাও চালাচ্ছে সমানে। এখনই এখনই মেটার কোনও লক্ষণ নেই পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ। এই পরিস্থিতির চাপও বাড়ছে উত্তরোত্তর হারে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত চরম সংকট দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি সংকট দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ফলে, আর্থিক চাপও বাড়ছে বিভিন্ন দেশে। কারণ, তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে, স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব পড়বে জিনিসপত্রে। ফলে, এই যুদ্ধের জেরে পরোক্ষে ভুক্তভোগী অনেক দেশ। যদিও হরমুজ প্রণালী দিয়ে একে একে জাহাজ আসছে ভারতে। ফলে, ভারতের পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
গুজবে কান না দেওয়ার আর্জি বিদেশমন্ত্রকের
কিন্তু হরমুজ দিয়ে জাহাজ আনতে কি টোল দিতে হচ্ছে ইরানকে? বেশ কিছু দিন ধরেই সেই নিয়ে চর্চা চলছে। জাহাজ পিছু ইরান ২ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ১৮.৮ কোটি টাকা টোল ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে খবর আসে সম্প্রতি। ভারতকেও চড়া টোল দিতে হচ্ছে কি না, উঠছিল প্রশ্ন। এবার সেই নিয়ে মুখ খোলে ভারতের বিদেশমন্ত্রক।ভারত টোল ফি দিয়ে হরমুজ থেকে জাহাজ বের করছে কি না, বৃহস্পতিবার জানতে চাওয়া হয় বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের কাছে। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে এমন কোনও আলোচনা হয়নি। অর্থাৎ কোটি কোটি টাকা দিয়ে জাহাজ বের করে আনতে হচ্ছে বলে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল, তা কার্যত খারিজ করে দিয়েছেন তিনি।
রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়ল
পশ্চিম এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের মধ্যেই মার্চ মাসে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা প্রায় ৯০% বাড়িয়েছে ভারত। একই সময়ে মোট তেল আমদানি প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। এর প্রধান কারণ পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ভারতের তেল আমদানিতে। এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে সমস্যা তৈরি হওয়ায় ভারতের এলপিজি আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহেও পতন দেখা গিয়েছে। ফলে বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হয়েছে ভারত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার তেল আমদানি কিছুটা কম ছিল। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ দিনের ছাড়ের সিদ্ধান্তের পর মার্চে আমদানি আবার বেড়েছে। এই ছাড়ের ফলে সমুদ্রে থাকা নিষিদ্ধ তেল কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
এপ্রিল মাসেও রাশিয়া থেকে তেল কেনা চলতে পারে
এ ছাড়া আফ্রিকার কিছু দেশ— অ্যাঙ্গোলা (Angola), গ্যাবন (Gabon), ঘানা (Ghana) এবং কঙ্গো (Congo) থেকেও আমদানি বেড়েছে। যদিও মোট আমদানিতে তাদের অবদান এখনও কম। রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি নিয়ে গ্লোবাল অ্যানালিটিক্স সংস্থা কেপলারের বিশ্লেষক সুমিত রিতোজা বলেন, ‘পশ্চিম এশিয়ার উৎপাদকরা পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু সরবরাহ ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রপথে সমস্যা থাকলেও ভারত কিছুটা তেল সংগ্রহ চালিয়ে যেতে পারছে।’ তিনি আরও জানান, এপ্রিল মাসেও রাশিয়া থেকে তেল কেনা চলতে পারে। পাশাপাশি ইরান এবং ভেনেজুয়েলা থেকেও তেল আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সরবরাহের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। অন্যদিকে, কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ মার্চে ৯২% কমেছে। এই ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণ হয়েছে আমেরিকা, ওমান, অ্যাঙ্গোলা, এবং নাইজেরিয়া থেকে বাড়তি আমদানির মাধ্যমে।
নানা ক্ষেত্রে ভারত-রাশিয়া পাশাপাশি
তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিনিময় ছাড়াও, মানতুরোভের এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে অপারেশন সিঁদুরের সময় রাশিয়ার তৈরি ‘এস-৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখেছিল দিল্লি। সেই সাফল্যের রেশ ধরেই আরও পাঁচটি এস-৪০০ ব্যবস্থা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। ২০১৮ সালের চুক্তি অনুযায়ী যে পাঁচটি সিস্টেম আসার কথা ছিল, তার মধ্যে তিনটি চলে এলেও বাকি দু’টি ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আটকে আছে। তবে মানতুরোভের আশ্বাস, কুডানকুলাম পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের কাজও নির্দিষ্ট সময়েই শেষ হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার প্রভাব কমানো, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করার ক্ষেত্রে ভারত-রাশিয়া পাশাপাশি রয়েছে।

Leave a Reply