মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আমেরিকায় থাকা অভিবাসীরা কতটা সরকারি সাহায্য পান, তার খতিয়ান তুলে ধরলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রবিবার সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে ওই অভিবাসীদের দেশের নামও উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, ১২০টি দেশের তালিকায় পাকিস্তান, বাংলাদেশ, চিন, নেপাল, ভুটানের নাম থাকলেও নেই ভারতের নাম। চার্টটির শিরোনাম ছিল ‘Immigrant welfare recipient rates by country of origin’। এতে দেশভিত্তিকভাবে দেখানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দেশের কত শতাংশ অভিবাসী পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে কোনো না কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা গ্রহণ করে।
কারা কত সহায়তা
কর্মসূত্রে বা অন্য কারণে বিভিন্ন দেশের মানুষ দীর্ঘ সময় বা পাকাপাকি ভাবে আমেরিকায় থাকেন। নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মানলে তবেই তাঁরা নাগরিকত্ব পেয়ে থাকেন। না-হলে অভিবাসী হিসাবে থাকতে হয় তাঁদের। আমেরিকায় বসবাসকারী অভিবাসীদের জন্য সরকারি কোষাগার থেকে কিছু অর্থ খরচ করা হয়। এই অর্থ তাঁদের সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন দেশের কতগুলি অভিবাসী পরিবার সরকারি সুবিধা পেয়েছে, তালিকায় তার উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভারতের প্রতিবেশী দেশ নেপাল। সে দেশের ৮১.৪ শতাংশ অভিবাসী পরিবার আমেরিকার সরকারি সাহায্য পেয়েছে। তার পর যথাক্রমে রয়েছে ইয়েমেন (৭৫.২), সোমালিয়া (৭১.৯)। তালিকায় রয়েছে আফগানিস্তান (৬৮.১), বাংলাদেশ (৫৪.৮), পাকিস্তান (৪০.২), চিন (৩২.৯) শতাংশ। কিন্তু কোথাও নেই ভারতের নাম।
কেন নেই ভারত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের উচ্চ আয় ও তুলনামূলক কম ওয়েলফেয়ার নির্ভরতা। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি আয়কারী জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফলে তাদের মধ্যে সরকারি সহায়তা নেওয়ার হার তুলনামূলকভাবে কম। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় আমেরিকানদের মধ্যম পারিবারিক আয় যুক্তরাষ্ট্রের গড় আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। এই কারণেই উচ্চ সহায়তা গ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকায় ভারতের নাম উঠে আসেনি। আমেরিকায় সরকারি সাহায্য তাঁরাই পান, যাঁদের রোজগার কম। তাই সকল অভিবাসী পরিবারকে সরকারি সাহায্য করা হয় না। আমেরিকায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের সংখ্যার বিচারে ভারতের স্থান দ্বিতীয়। আবার রিপোর্ট বলছে, ভারতীয় অভিবাসীরাই আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি রোজগার করে থাকেন। সে দিক দিয়ে দেখলে তাঁদের সরকারি সাহায্য না পেলেও চলে।
যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় আমেরিকানদের চিত্র
২০২৩ সালের মার্কিন সেন্সাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫২ লক্ষ মানুষ নিজেদের ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এরা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম এশীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী, যা মোট এশীয় জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ। এই শ্রেণিতে ভারতে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূতরাও অন্তর্ভুক্ত।
আয়ের পরিসংখ্যান কী বলছে?
২০২৩ সালে ভারতীয় পরিবারপ্রধানদের মধ্যম বার্ষিক আয় ছিল ১,৫১,২০০ ডলার। সব এশীয় পরিবারপ্রধানের ক্ষেত্রে এই আয় ছিল ১,০৫,৬০০ ডলার। ভারতীয় অভিবাসী পরিবারপ্রধানদের মধ্যম আয় ছিল ১,৫৬,০০০ ডলার, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ভারতীয় পরিবারপ্রধানদের আয় ছিল ১,২০,২০০ ডলার। ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষেত্রেও ভারতীয়রা এগিয়ে। ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সী ভারতীয় আমেরিকানদের মধ্যম বার্ষিক আয় ছিল ৮৫,৩০০ ডলার। সব এশীয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই আয় ছিল ৫২,৪০০ ডলার। পূর্ণকালীন কর্মীদের মধ্যে ভারতীয়দের মধ্যম আয় ১,০৬,৪০০ ডলার, যেখানে এশীয়দের সামগ্রিক গড় ৭৫,০০০ ডলার।
শিক্ষার প্রভাব
উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতাও ভারতীয় আমেরিকানদের সাফল্যের অন্যতম কারণ। ২৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ভারতীয় আমেরিকানদের ৭৭ শতাংশের স্নাতক বা তার ঊর্ধ্বতন ডিগ্রি রয়েছে। এর মধ্যে ৩১ শতাংশের স্নাতক এবং ৪৫ শতাংশের স্নাতকোত্তর বা তার বেশি ডিগ্রি আছে। সব এশীয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ৫৬ শতাংশ। অভিবাসী ও যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া—উভয় শ্রেণির ভারতীয়দের মধ্যেই উচ্চশিক্ষার হার প্রায় সমান।
দারিদ্র্য ও গৃহস্বত্ব
দারিদ্র্যের হার কম হওয়াও ভারতের অনুপস্থিতির আরেকটি কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয়দের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। সব এশীয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ১০ শতাংশ। অভিবাসী ও যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া—উভয় ক্ষেত্রেই ভারতীয়দের দারিদ্র্যের হার একই, ৬ শতাংশ। বাড়ির মালিকানার ক্ষেত্রেও ভারতীয়রা এশীয় গড়ের কাছাকাছি। ভারতীয় পরিবারপ্রধানদের ৬২ শতাংশ নিজস্ব বাড়ির মালিক। অভিবাসী ভারতীয়দের মধ্যে এই হার ৬৩ শতাংশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ভারতীয়দের মধ্যে ৫৪ শতাংশ।
ভারতীয়দের দাপট
দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসেই অভিবাসন নীতি কঠোর করার বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। অভিবাসীদের জন্য সরকারি ব্যয়বরাদ্দ কাটছাঁট করার কথাও বলেছেন। এই আবহে তাঁর এই তালিকা প্রকাশ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ভারতের নাম সেই তালিকায় না-থাকা। তবে, বিশেষজ্ঞদের মতে এর পিছনে রয়েছে মার্কিন মুলুকে ভারতীয়দের দাপট। উচ্চ আয়, উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কম দারিদ্র্যের হার—এই তিনটি প্রধান কারণের সম্মিলিত প্রভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা ওয়েলফেয়ার বা সরকারি সহায়তার ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল। সেই কারণেই ট্রাম্প প্রকাশিত অভিবাসী কল্যাণ তালিকায় ভারত জায়গা পায়নি।

Leave a Reply