তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
বর্ষার মরশুম শেষ হলেও বৃষ্টি পিছু ছাড়ছে না। নিম্নচাপের জেরে আকাশে কালো মেঘ জমাট বাঁধছে। হেমন্তের শুরুতেও রাজ্যজুড়ে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। আর তার মাঝেই বিপদ বাড়াচ্ছে ম্যালেরিয়া। ডেঙ্গির প্রকোপ নিয়ে চিন্তিত স্বাস্থ্য দফতর। রাজ্যের একাধিক জেলায় ডেঙ্গি রুখতে সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আর তার মাঝেই ক্রমশ শক্তি বাড়াচ্ছে ম্যালেরিয়া। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, শীতেও রেহাই পাওয়া যাবে না। বরং, সতর্ক না হলেই বড় বিপদ ঘটতে পারে।
শীতেও কি দাপট দেখাতে পারে ম্যালেরিয়া?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, শীতের মরশুম এলেই মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কমে যাবে, এমনটা একেবারেই নয়। বছরভর মশাবাহিত রোগের দাপট রয়েছে। শীতে কিছুটা কমলেও, একেবারে হবে না, একথা বলা যায় না। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চলতি বছরে শীতকালেও রাজ্যের একাধিক জেলায় ম্যালেরিয়ার দাপট চলবে। এই বছরে কলকাতা, উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং মুর্শিদাবাদে ম্যালেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির জেরে বিভিন্ন এলাকায় জল জমছে। ফলে মশাবাহিত রোগের দাপট ও জারি রয়েছে। মশার বংশবিস্তারের জেরেই ম্যালেরিয়ার দাপট বেড়েছে বলেই জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাই শীতকালেও মশাবাহিত এই রোগের প্রকোপ থাকবে।
রাজ্যে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কতখানি?
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখনো পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি মানুষ এই রাজ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। কলকাতা, উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ যথেষ্ট উদ্বেগজনক। পাশপাশি মালদা, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ারের মতো জেলাগুলোতেও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ দেখা দিচ্ছে। বর্ষার মরশুমে ডেঙ্গির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ম্যালেরিয়ার দাপট বেড়েছে। তাই সেই এলাকাগুলোয় শীতকালেও মশাবাহিত রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের জেরেই কি ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বাড়ছে?
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন ম্যালেরিয়ার মতো রোগের দাপট বাড়ানোর অন্যতম কারণ। বিশেষত, ভাইরাস ঘটিত একাধিক রোগের চরিত্র বদল হচ্ছে। ম্যালেরিয়ারও চরিত্র বদল হয়েছে। সংক্রমণের পরেও চরিত্র বদল করছে। অনেক সময়েই তাই আক্রান্তের শরীরে নতুন ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
তাছাড়া শীতের মরশুমেও ম্যালেরিয়া সংক্রমণ অব্যহত থাকছে। তার অন্যতম কারণ মশার বংশবিস্তার ক্রমশ হচ্ছে। লাগাতার বৃষ্টির জেরে জমা জলের সমস্যা থাকছে। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহেও জমা জলের সমস্যা থাকছে। এর জেরে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। তাই শীতেও মশা বাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে।
শিশুদের কি ম্যালেরিয়ার টিকা দেওয়া যাবে?
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, ম্যালেরিয়া রুখতে শিশুদের টিকা দেওয়া যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মতো শিশুদের ম্যালেরিয়ার টিকা দেওয়া যেতে পারে। সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও সুপারিশ রয়েছে। শিশুর পাঁচ বছর বয়সের পরে এই টিকাকরণ করা সম্ভব। তবে কতগুলো ডোজ দিতে হবে, সে নিয়েও নির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে প্রয়োজন অনুযায়ী, শিশুকে ম্যালেরিয়ার টিকা দেওয়া যেতে পারে।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করলেই শিশুর ম্যালেরিয়ার টিকাকরণ সম্পর্কে সমস্ত তথ্য পাওয়া যাবে। ভারতে এই টিকা করণের ব্যবস্থা কেমন সে সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া সহজ হবে।
শীতের মরশুমে ম্যালেরিয়ার দাপট কমাতে কী পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা?
জমা জল পরিষ্কারে বাড়তি নজর!
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ম্যালেরিয়ার দাপট কমাতে বাড়ির আশপাশের এলাকা পরিষ্কার করা জরুরি। প্রত্যেকের মধ্যে এই নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ, বাগান, ছাদ কিংবা বাড়ির আশপাশের এলাকা পরিষ্কার না হলে মশার বংশবিস্তার সহজ হয়। তখন মশাবাহিত রোগের দাপট ও বাড়ে। তাই শীতের মরশুমে ম্যালেরিয়ার দাপট কমাতে আশপাশ পরিষ্কারের দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে। আগাছা পরিষ্কার ও অপ্রয়োজনীয় জল জমতে না দেওয়ার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বাগান থাকলে অবশ্যই সেটা পরিচ্ছন্ন করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সন্ধ্যার পরে হাত-পা ঢাকা পোশাক পরা জরুরি!
মশার কামড় এড়াতে হাত-পা ঢাকা পোশাক পরতে হবে। বিশেষত সন্ধ্যার পরে বাইরে গেলে হাত-পা ঢাকা পোশাক পরার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
দ্রুত রোগ নির্ণয়, না হলেই সংক্রমণের দাপট বৃদ্ধি!
জ্বর হলে একেবারেই অবহেলা করা চলবে না। চিকিৎসকদের পরামর্শ মতো রক্ত পরীক্ষা করিয়ে জ্বরের কারণ জানতে হবে। তবেই রোগ চিহ্নিত হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করা যাবে। ম্যালেরিয়ার মতো রোগ প্রথম ধাপে চিহ্নিত না হলে, এলাকায় ক্রমশ সংক্রমণ বাড়বে। এর ফলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠবে। তাছাড়া রোগ নির্ণয় দেরিতে হলেও, চিকিৎসা শুরু করলেও দেরি হয়ে যায়। তার জেরে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে।

Leave a Reply