World Indigenous Day: প্রকৃতিই প্রথম পবিত্র স্থান! বিশ্ব আদিবাসী দিবসে উঠে আসুক জনজাতি ঐতিহ্যের কথা

nature-is-the-first-sacred-place-lets-talk-about-tribal-traditions-on-international-day-of-the-worlds-indigenous-peoples

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: প্রতি বছর ৯ অগাস্ট পালিত হয় বিশ্ব আদিবাসী দিবস (World Indigenous Day)। বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্যকে তুলে ধরাই এই দিনের মূল উদ্দেশ্য। ভারতের ক্ষেত্রেও এই দিনটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জনজাতি সম্প্রদায়গুলি বহন করে চলেছে বহু প্রাচীন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য। ভারতের জনজাতি বা তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৃহত্তর হিন্দু ঐতিহ্যের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ও রাজনীতির আলোচনার বিষয়। এই সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান, পারস্পরিক প্রভাব এবং বহু অভিন্ন পবিত্র ঐতিহ্য। মধ্য, পূর্ব, পশ্চিম ও হিমালয়-সংলগ্ন ভারতের বহু জনজাতি ঐতিহাসিকভাবে মহাদেব বা শিব, শক্তির স্থানীয় রূপ, গ্রামদেবতা, পূর্বপুরুষের আত্মা, পাহাড়, বন, নদী ও পবিত্র বনভূমির আরাধনা করে এসেছে।

প্রকৃতিই প্রথম পবিত্র স্থান

ভারতের প্রাচীনতম জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি বড় অংশ জনজাতি সমাজে (Janajatiya Culture) সংরক্ষিত রয়েছে। বন, পাহাড়, নদী উপত্যকা ও মালভূমিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করতে গিয়ে তাঁরা প্রকৃতি, পূর্বপুরুষ ও স্থানীয় দেবতাকে কেন্দ্র করে নিজস্ব ধর্মীয় পরম্পরা গড়ে তুলেছেন। সংগঠিত মন্দির সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বহু আগে থেকেই পবিত্র বন, পাহাড়, নদী, গুহা ও প্রাচীন গাছ ছিল উপাসনার স্থান। প্রকৃতি তাঁদের কাছে শুধু জীবিকার উৎস নয়, আধ্যাত্মিক বিশ্বাসেরও কেন্দ্র।

পবিত্র ভূদৃশ্য ও প্রকৃতির প্রতীক

বিভিন্ন জনজাতি অঞ্চলের পাহাড়, নদী, বন ও উপত্যকার সঙ্গে স্থানীয় দেবতা, পূর্বপুরুষ এবং ধর্মীয় কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে। গাছ, পশুপাখি, সূর্য, চাঁদ, মাটি ও নদীর মতো প্রাকৃতিক উপাদানও অনেক সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র প্রতীক। পবিত্র বন বা ‘সেক্রেড গ্রোভ’-কে ঘিরে উপাসনা ও নানা আচার আজও বহু জায়গায় প্রচলিত। একইসঙ্গে এই বনগুলি স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

জনজাতি ঐতিহ্যে মহাদেব

শিবকে শুধু মহাজাগতিক দেবতা নয়, বন, পাহাড়, পশু, সাধক, শিকারি ও জনজাতি মানুষের সঙ্গেও যুক্ত দেবতা হিসেবে দেখা হয়। ‘মহাদেব’, ‘পশুপতি’, ‘গিরিশ’, ‘কিরাত’ ও ‘ভূতেশ্বর’-এর মতো উপাধিতে তাঁর সঙ্গে জঙ্গল, পাহাড়, পশুজগৎ ও জনবসতির প্রান্তবর্তী জীবনের সম্পর্কের প্রতিফলন পাওয়া যায়। বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় দেবতা ও প্রকৃতি-কেন্দ্রিক বিশ্বাসের সঙ্গে শিব-আরাধনার সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্পর্ক সব সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে একরকম নয়, প্রত্যেকের নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে।

শক্তির স্থানীয় রূপ

শক্তি বা দেবী-উপাসনাতেও জনজাতি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রয়েছে। বহু স্থানীয় দেবীকে উর্বরতা, কৃষি, বন, নদী, রোগ থেকে সুরক্ষা, মাটি ও জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কোথাও তাঁরা গ্রামরক্ষাকারী, কোথাও ফসলের রক্ষক, আবার কোথাও পাহাড় বা অরণ্যের অধিষ্ঠাত্রী শক্তি। এই স্থানীয় দেবী-পরম্পরার সঙ্গে বৃহত্তর শক্তি-উপাসনার বিভিন্ন ধারারও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে।

নিজস্ব ঐতিহ্যের স্বাতন্ত্র্য

তবে জনজাতি সংস্কৃতিকে শুধুমাত্র বৃহত্তর কোনও ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা, দেবতা, লোককথা, আচার, উৎসব ও সামাজিক রীতি রয়েছে। কোথাও প্রকৃতি ও পূর্বপুরুষের উপাসনা প্রধান, কোথাও স্থানীয় দেবতার গুরুত্ব বেশি, আবার কোথাও শিব-শক্তির সঙ্গে স্থানীয় বিশ্বাসের মেলবন্ধন ঘটেছে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই রয়েছে ভারতের জনজাতি সংস্কৃতির নিজস্ব পরিচয়।

ঔপনিবেশিক শ্রেণিবিন্যাস ও ভিন্ন বয়ান

ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ প্রশাসন ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে সামাজিক ও ধর্মীয় শ্রেণিতে ভাগ করার চেষ্টা করে। বহু জটিল স্থানীয় বিশ্বাসকে তখন নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির মধ্যে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। বিভিন্ন ঔপনিবেশিক নথি ও গবেষণায় কখনও জনজাতি সমাজকে মূলধারার ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে পৃথক হিসেবে দেখানো হয়েছে, আবার কখনও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কথাও উঠে এসেছে। ফলে জনজাতি পরিচয় নিয়ে একাধিক বয়ান তৈরি হয়।

গবেষণা ও পরিচয়ের প্রশ্ন

আধুনিক ইতিহাস ও নৃতত্ত্বের গবেষণায় জনজাতি ধর্মীয় ঐতিহ্যকে প্রকৃতি, পূর্বপুরুষ, স্থানীয় দেবতা, সামাজিক কাঠামো এবং বৃহত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়। আধুনিক ভারতেও জনজাতি পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। নিজস্ব ভাষা, আচার ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই বৃহত্তর ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রশ্নও আলোচিত।

সংবিধানে স্বীকৃতি

ভারতের সংবিধান তফসিলি উপজাতি (Tribal Culture India) সম্প্রদায়গুলির জন্য বিশেষ সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছে। তাঁদের সামাজিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্ব আদিবাসী দিবস তাই শুধু অধিকার ও পরিচয়ের কথা বলার দিন নয়; এটি বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রাচীন সংস্কৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক এবং পবিত্র ঐতিহ্যকে স্মরণ করারও দিন। ভারতের জনজাতি সমাজের প্রকৃতি-কেন্দ্রিক জীবনদর্শন, পবিত্র বন, স্থানীয় দেবদেবী, পূর্বপুরুষের স্মরণ, লোকাচার ও উৎসব দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৃহত্তর ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যোগাযোগ যেমন এই ইতিহাসের একটি দিক, তেমনই প্রতিটি জনজাতি সম্প্রদায়ের নিজস্ব পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভিন্ন বিশ্বাস ও পবিত্র ঐতিহ্যের এই বহুস্বরই ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share