মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আগুনে পুড়েও, ফুরিয়ে যায়নি ৫০০ বছরের ঐতিহ্য। প্রতি বছর রথযাত্রার সময় প্রভু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথ টানার উৎসবে মেতে ওঠেন ভক্তরা। পুরী বা আমেদাবাদের রথযাত্রার কথা আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, একসময় পৃথিবীর অন্যতম সেরা ও বিশাল রথযাত্রা হত বাংলাদেশের ঢাকার কাছে ধামরাইয়ে (Dhamrai Rath Yatra)। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই রথযাত্রার ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনই কষ্টেরও। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এর ওপর নির্মম আঘাত হেনেছিল। তার জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল রথ, যদিও মুছে ফেলা যায়নি ভক্তদের মনের বিশ্বাসকে।
৫০০ বছরের পুরানো উৎসব
ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে ধামরাই জনপদ। এখানকার রথযাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় ৫০০ বছর আগে (500 Year Old Rath Yatra Bangladesh)। পুরানো ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৬৭২ সালেও এই রথযাত্রা উৎসব হত খুব ধুমধাম করে। উৎসব দেখতে একসময় শুধু বাংলা নয়, ওড়িশা, অসম, মায় নেপাল থেকেও হাজার হাজার মানুষ এই উৎসবে যোগ দিতেন। টানা এক মাস ধরে চলত মেলা। হত নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ধামরাইয়ের বিখ্যাত যশোমাধব মন্দির থেকে যাত্রা শুরু করত রথ। শেষ হত আধ কিলোমিটার দূরের গোপীনগর মন্দিরে গিয়ে।
পুরীর রথের চেয়েও বড় ধামরাইয়ের রথ (Dhamrai Rath Yatra)!
উনিশ শতকের শুরুর দিকে ধামরাইয়ের জমিদাররা মিলে একটি বিশাল কাঠের রথ তৈরি করেন। এলাকার সেরা কাঠমিস্ত্রিরা প্রায় এক বছর ধরে এই রথটি বানিয়েছিলেন। রথটি ছিল প্রায় ৬০ ফুট উঁচু (60 feet tall Dhamrai Rath)। পুরীর বর্তমান রথটি ৪৪ ফুট উঁচু, অর্থাৎ ধামরাইয়ের রথটি ছিল তার চেয়েও ঢের বড়। রথে ছিল ৩২টি বিশাল কাঠের চাকা। রথটি টানার জন্য প্রায় ১,০০০ কেজি ওজনের মোটা দড়ি ব্যবহার করা হত।
দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহা ও ১৯৭১-এর কালো অধ্যায়
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান আলাদা হওয়ার পর জমিদারি প্রথা লোপ পেলে রথযাত্রার আয়োজকরা পড়েন ঘোর সঙ্কটে। তখন গর্বের এই ঐতিহ্য বাঁচাতে এগিয়ে আসেন টাঙ্গাইলের বিখ্যাত দানবীর তথা সমাজসেবক রণদাপ্রসাদ সাহা (আরপি সাহা)। তিনি নিজের খরচে এই রথ ও উৎসবের সব দায়িত্ব নেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের (Bangladesh) মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সব ওলটপালট হয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রণদাপ্রসাদ ও তাঁর ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর আর খোঁজ মেলেনি তাঁদের।
রথ পুড়িয়ে দিল পাক বাহিনী
পাক হানাদারদের অত্যাচারের জেরে যে কেবল রণদাপ্রসাদ ও তাঁর জওয়ান ছেলে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন তা নয়, দুষ্কৃতীরা ইতিহাসখ্যাত এই রথে আগুন লাগিয়ে দেয়। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১০ জুন। রোষের আগুনে সপ্তাহখানেক ধরে ধিকধিক করে পুড়ে গিয়েছিল ধামরাই তথা তামাম বাংলার এই গর্ব। রথ পুড়ে যাওয়ায় ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে ধামরাইয়ে রথযাত্রা হয়নি। বাংলাদেশের ৫০০ বছরের এই রথযাত্রার ইতিহাসে (500 Year Old Rath Yatra Bangladesh) এটি ছিল একটি বড় আঘাত।
নতুন করে পথ চলা ও ভারতের সাহায্য
স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর ১৯৭৩ সালে একটি ছোট রথ বানিয়ে ফের শুরু হয় উৎসব। যদিও আগের সেই জাঁকজমক আর ছিল না। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের আসাও অনেকটাই কমে গিয়েছিল। এরপর কেটে গিয়েছে বহু বছর। ২০০৯ সালে ভারত সরকার (Indian govt) ধামরাইয়ের এই ঐতিহ্য বাঁচাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ভারত সরকারের আর্থিক সহায়তায় ২০১০ সালে একটি নতুন রথ নির্মাণ করে শুরু হয় উৎসব। এই নতুন রথটি ৪০ ফুট উঁচু, চাকা রয়েছে ১৬টি। সেই থেকে ফি বছর উৎসবে টানা হয় এই রথটিই। আজও ধামরাইয়ে প্রতি বছর রথযাত্রা হয়। বসে মেলাও। রথের রশি ছুঁয়ে পুণ্য অর্জন করে হাজারো ভক্ত। আগের সেই অতিকায় রথ আর নেই, ফুরিয়ে গিয়েছে সেদিনের সেই জাঁকও। তবে ধামরাইয়ের বাসিন্দাদের মন থেকে মুছে ফেলা যায়নি সেই ৬০ ফুটের কাঠের রথ এবং তাকে কেন্দ্র করে সপ্তাহভর উৎসবের ছবি। বস্তুত, এটাই ধামরাইয়ের রথযাত্রার আসল শক্তি।

Leave a Reply