মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য অধ্যায়। কোটি কোটি বাঙালির কাছে আজও তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি চিরকালের ‘মহানায়ক’। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার ভবানীপুরে জন্ম নেওয়া অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় পরবর্তীকালে উত্তম কুমার নামে রুপোলি পর্দায় এমন এক জাদু সৃষ্টি করেছিলেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমান উজ্জ্বল। তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্তিতে শ্রদ্ধা জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষ ভিডিও পোস্ট প্রধানমন্ত্রীর
মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সমাজমাধ্যমে একটি বিশেষ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই ভিডিওতে মহানায়কের জীবনের নানা মুহূর্ত, চলচ্চিত্রের বিভিন্ন স্থিরচিত্রের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নিজের কণ্ঠে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমার প্রিয় দেশবাসী, ৩ সেপ্টেম্বর আমরা মহানায়ক উত্তম কুমারজির জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করব। বন্ধুরা, উত্তম কুমারজি ছিলেন একজন বহুমুখী অভিনেতা, যিনি তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। চলচ্চিত্র প্রেমীদের বিশ্বাস যে, সত্যজিৎ রায়জি ‘নায়ক – দ্য হিরো’ চলচ্চিত্রের পুরো চিত্রনাট্য মহানায়ক উত্তম কুমারজি-কে মনে রেখেই লিখেছিলেন। শ্রীমান সত্যজিৎ রায় একবার বলেছিলেন যে, উত্তম কুমারের মধ্যে সংযম ও নীতিবোধের পাশাপাশি এক অদ্ভুত আবেগ ছিল। চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলতে তিনি অত্যন্ত পরিশ্রম করতেন।”
‘কখনও হাল না ছাড়া’— উত্তমের জীবন থেকে শিক্ষার কথা মোদির
শুধু অভিনয় প্রতিভাই নয়, উত্তম কুমারের ব্যক্তিত্ব এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতার কথাও নিজের বক্তব্যে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মহানায়কের জীবন নতুন প্রজন্মের কাছেও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মোদির কথায়, “উত্তম কুমারজি শুধু তাঁর সহজ-স্বাভাবিক অভিনয়ের জন্যই পরিচিত ছিলেন না, বরং তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজের জন্যও পরিচিত ছিলেন। তাঁর জীবন আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও দেয় — তা হল কখনও হাল না ছাড়া। তাঁর শুরুর দিকের চলচ্চিত্রগুলো খুব একটা সফল হয়নি, কিন্তু তিনি নিজের কাজে মনোযোগ বজায় রেখেছিলেন। আর সেই উৎসর্গই তাঁকে এত উচ্চতায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল।”
ব্যক্তিগত স্মৃতি ভাগ করলেন মোদি
প্রধানমন্ত্রী তাঁর কলকাতা সফরের একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিও ভাগ করে নেন। তিনি বলেন, “বন্ধুরা, আমার মনে আছে যখন আমি কলকাতায় রোড শো করছিলাম, তখন আমি উত্তম কুমারজির বাড়ির সামনে দিয়েও গিয়েছিলাম। সেখানে একজন ব্যক্তি আমাকে তাঁর একটি ছবি উপহার দিয়েছিলেন। আমি আরও একবার মহানায়ক উত্তম কুমারজির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি। তিনি সর্বদাই আমাদের সবার হৃদয়ে রাজত্ব করবেন। মহানায়ক উত্তম কুমার চিরদিন মানুষের হৃদয়ে রাজ করবেন।”
ভিডিওটির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী যে ক্যাপশনটি পোস্ট করেন, সেখানে লেখা হয়— “মহানায়ক উত্তম কুমার… এক কিংবদন্তি যাঁর কালজয়ী পরিবেশনা প্রজন্মান্তরের মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে চলেছে। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি। গত রবিবার মন কি বাত অনুষ্ঠানে আমি তাঁর সম্পর্কে যা বলেছিলাম, তাও শেয়ার করছি।”
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শ্রদ্ধার্ঘ্য
মহানায়ক উত্তম কুমারের শতবর্ষ জন্মজয়ন্তীতে সমাজমাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। নিজের পোস্টে তিনি মহানায়কের অভিনয় প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব এবং বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের কথা স্মরণ করেন। মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, “তাঁর অনন্য অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও চিরস্মরণীয় উপস্থিতি বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালির হৃদয়ে তিনি চিরকাল মহানায়ক হয়েই বেঁচে থাকবেন।”
ভবানীপুরের অরুণ থেকে বাংলা সিনেমার চিরন্তন মহানায়ক
১৯২৬ সালের এই দিনে কলকাতার ভবানীপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়ের। পরবর্তীকালে ‘উত্তম কুমার’ নামেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী অভিনেতাদের অন্যতম। তাঁর স্বাভাবিক অভিনয়, সংযত অভিব্যক্তি, পর্দার ব্যক্তিত্ব এবং দর্শকের সঙ্গে গভীর আবেগের সংযোগ তাঁকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের প্রতীক উত্তম কুমার আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর অভিনীত অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র এখনও বাঙালির সংস্কৃতি, আবেগ এবং স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। জন্মশতবর্ষে প্রধানমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী— সকলের শ্রদ্ধার্ঘ্য যেন আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিল, মহানায়ক কেবল রুপোলি পর্দাতেই নন, মানুষের হৃদয়েও আজীবন অমর।

Leave a Reply