মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ভেদাভেদ মুছে দিতে প্রতি মাসেই উত্তরবঙ্গে যাবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu in North Bengal)। প্রতি সপ্তাহে উত্তরকন্যায় বসবেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী। অবহেলিত থাকবে না পাহাড়-ডুয়ার্স। ঢেলে সাজানো হবে, উন্নয়নের জোয়ার আসবে। দুর্নীতি দূর করতে খোলা হবে জিটিএ ফাইল। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বুধবার প্রথমবার উত্তরবঙ্গ সফরে (North Bengal Visit) এসে আশ্বাসবাণী শোনালেন শুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari)। এই সফরকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অলিন্দে ছিল টানটান উত্তেজনা। শিলিগুড়ির প্রশাসনিক সভা থেকে শুরু করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি সেরে আজ বিকেলেই তাঁর কলকাতায় ফিরছেন শুভেন্দু।
খোলা হবে জিটিএ-ফাইল
উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন নিয়ে শিলিগুড়িতে নেমেই বড় বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জিটিএ (গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)-এ কীভাবে কাজ হয়েছে? কতটা কাজ হয়েছে? সেইসব ফাইল এবার খোলা হবে। সেই কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূল সরকারের আমলে জিটিএ দুর্নীতি হয়েছে বলে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছিল। সেসব ধামাচাপা পড়ে যায় বলে বিজেপির তরফে অভিযোগ। এবার বিজেপি সরকার কাজ শুরুর পরেই জিটিএ দুর্নীতির তদন্ত শুরু হবে। ফাইল খোলা হবে।উত্তরবঙ্গে নেমেই পাহাড়ে ‘সাফাই অভিযানে’র হুঁশিয়ারি শুভেন্দুর।
প্রতিটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে
উত্তরবঙ্গের মাটিতে পা দিয়েই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বলেন, বিধানসভা নির্বাচনের আগে উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে বিজেপির দেওয়া প্রতিটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করবে তাঁর সরকার। এদিন একপাশে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা এবং অন্যপাশে নবনিযুক্ত উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে সঙ্গে নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন শুভেন্দু অধিকারী। অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেন, “২০০৯ সাল থেকে উত্তরবঙ্গের মানুষ দু’হাত উজাড় করে বিজেপির পাশে থেকেছেন। তাই এবার আমাদের ঋণ শোধ করার পালা। সরকারে আসার পর ভোটের আগে দেওয়া আমাদের সমস্ত প্রতিশ্রুতি আমরা পূরণ করবই।”
মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে বাগডোগরায় বিপুল জমায়েত
বুধবার সকাল থেকেই মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে বাগডোগরা বিমানবন্দরের বাইরে এবং রাস্তার দু’পাশে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন হাজার হাজার বিজেপি কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। বিমানবন্দর থেকে বাইরে বেরিয়েই উত্তরবঙ্গের মানুষের ভালবাসায় আপ্লুত মুখ্যমন্ত্রী হাতজোড় করে সকলকে নমস্কার ও কৃতজ্ঞতা জানান। লোকসভা থেকে শুরু করে বিধানসভা— বছরের পর বছর ধরে বিজেপিকে বিপুল ভোটে জেতানোর জন্য উত্তরবঙ্গবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছাও জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, “এবার থেকে প্রতি মাসে আমি এবং মন্ত্রিসভার সদস্যরা উত্তরবঙ্গে আসব। তবে আমরা এখানে কোনও পাহাড়ি হাওয়া খেতে বা ঘুরতে আসব না, স্রেফ কাজ করতে আসব। আর প্রতি সপ্তাহে আমাদের উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উত্তরকন্যায় বসবেন।”
‘উত্তরকন্যায়’ প্রশাসনিক বৈঠক
বিমানবন্দর থেকে সোজা শিলিগুড়ির স্যাটেলাইট টাউনশিপে অবস্থিত রাজ্য সরকারের মিনি সচিবালয় ‘উত্তরকন্যায়’ পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে উত্তরের পাঁচ জেলার বিধায়ক, আইজিপি, পুলিশ সুপার এবং প্রশাসনের শীর্ষ আমলাদের নিয়ে এক প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠকে বসেন তিনি। নবান্ন সূত্রে খবর, সামনেই বর্ষাকাল কড়া নাড়ছে, তাই এই বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় উত্তরবঙ্গের চিরাচরিত সমস্যা – বন্যা, পাহাড়ি ধস, হড়পা বান এবং নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতি। এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানান , উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক প্রতি সপ্তাহে একদিন উত্তরকন্যায় সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সাধারণ মানুষদের সঙ্গে দেখা করবেন। ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত তিনি উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের কর্মসূচির প্রতিটি কাজের খতিয়ান করবেন। আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি বেলা ২টো থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের প্রত্যেক সাংসদ, বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
চা বলয়ের শ্রমিকদের নিয়ে আলোচনা
এদিনের বৈঠকে উত্তরবঙ্গের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং চা বলয়ের শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি ও চিকিৎসা পরিষেবার সমস্যা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, রাজ্যে সরকার বদল হতেই উত্তরবঙ্গের বেআইনি নির্মাণ, সরকারি জমি দখল এবং নদী থেকে অবৈধভাবে বালি ও পাথর পাচারকারী মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য রুখতে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ (Zero Tolerance) নীতি নেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
আইনশৃঙ্খলা বজায় থাকবে
উন্নয়ন ছাড়াও শুভেন্দুর মুখে শোনা যায় উত্তরবঙ্গের আইনশৃঙ্খলার কথাও। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে সরকারের অনমনীয় নীতি বজায় থাকবে। তাঁর কথায়, ‘‘রাজ্যে কোনও ভাবেই তোলাবাজি, গুন্ডাগিরি বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি সহ্য করা হবে না। যাঁরা ভাবছেন পুরনো কায়দায় পার পেয়ে যাবেন, তাঁরা ভুল ভাবছেন। আইন আইনের পথেই চলবে।’’
উত্তরবঙ্গ বরাবরই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি
উত্তরবঙ্গ বরাবরই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। লোকসভা হোক বা বিধানসভা— গত এক দশক ধরে এই উত্তরবঙ্গে ভাল ফল করছে বিজেপি। উল্লেখ্য, এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি একাই জিতেছে ৪০টি। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রে জিতেছিল বিজেপি। সে বার বিজেপির টিকিটে ওই কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন যশবন্ত সিং। ২০১৪ সালেই দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্র ধরে রেখেছিল বিজেপি। সে বছর ওই কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে জিতেছিলেন সুরেন্দ্র সিংহ অহলুওয়ালিয়া। ২০১৯ সাল থেকে টানা ওই কেন্দ্রে জিতছেন রাজু বিস্তা। উত্তরকন্যায় পৌঁছনোর আগে এদিন শিলিগুড়িতে বিজেপির জেলা পার্টি অফিসে যান শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে যাওয়ার আগে রাস্তায় মাঝেমধ্যেই থমকেছে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়। গাড়ি থেকে রাস্তায় নেমে সাধারণ মানুষের অভিবাদন গ্রহণ করেন তিনি। ছোট শিশুকে কোলে নিতেও দেখা যায়। জনজোয়ারে ভেসে মুখ্যমন্ত্রী এদিন শিলিগুড়ির বিজেপি কার্যালয়ে যান। উন্নয়নের পাশাপাশি বিজেপি কর্মীরা আরও বেশি করে সংগঠনের কাজ করবেন। সেই বার্তাও এদিন শুভেন্দু অধিকারী দিয়েছেন।

Leave a Reply