মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: জমি না থাকার ফলে তাজপুরে গভীর সমুদ্রবন্দর (Tajpur Seaport) হওয়া সম্ভব নয়। বিকল্প হিসেবে দাদনপত্রবাড়ে হতে পারে গভীর সমুদ্রবন্দর। বৃহস্পতিবার নবান্ন থেকে এমনটাই ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তিনি জানিয়েছেন, তাজপুরের প্রকল্পটি সম্পর্কে আদানিদের সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে। ওই প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত জমি রাজ্য সরকারের কাছে নেই। তাই তাজপুর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে দাদনপাত্রবাড়কে কেন্দ্র করে নতুন পরিকল্পনা সাজিয়েছে সরকার। সেখানে ১৭০০ একর জমি রাজ্যের মালিকানাধীন। বন্দর, উপকূলবর্তী এলাকা এবং কলকাতার নদী সংলগ্ন এলাকা নিয়ে বৃহস্পতিবার নবান্নে একটি বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই নির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তাজপুরে গভীর সমুদ্রবন্দর
পূর্বতন রাজ্য সরকারের আমল থেকেই শোনা গিয়েছিল তাজপুরে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি হবে। তার ফলে বদলে যাবে তাজপুরের চেহারা। বাড়বে কর্মসংস্থান। তবে সে প্রকল্প আজও বাস্তবায়িত হয়নি। রাজ্য সরকারের পালাবদলের পর এই বিষয়ে নজর দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার করণ আদানির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বাস্তব সমস্যা উপলব্ধি করেই শিল্পের জন্য বিকল্প পথ খুঁজলেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন শুভেন্দু বলেন, “তাজপুরে সরকারের কাছে জমি নেই। তাই সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর হওয়া সম্ভব নয়। তার পরিবর্তে তাজপুর থেকে ১০ কিমি দূরে দাদনপাত্রবাড়ে যেখানে নুনের পুরনো কারখানা ছিল সেখানে ১ হাজার ৭০০ একর জমি রয়েছে। ওই জায়গাটির কথা করণ আদানিকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।” পরবর্তীকালে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলেও জানান তিনি।
কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রকের সঙ্গে আলোচনা
কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রকের সঙ্গেও তাজপুর নিয়ে কথা হয়ে গিয়েছে শুভেন্দুর। তিনি বলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে। তিনি অনুমতি দিয়েছেন। তাজপুরের বদলে দাদনপত্রবাড়ে আমরা বাস্তবসম্মত ভাবে এগোব।’’
ওয়াটার মেট্রো কলকাতায়
রাজ্য সরকারের পালাবদলের পরই কলকাতার জলপথ পরিবহণে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ভাবনাচিন্তায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, এবার কলকাতায় চালু হতে চলেছে ওয়াটার মেট্রো। এখনও পর্যন্ত দেশের মোট ১৭টি জায়গায় এই পরিষেবা চালু রয়েছে। ১৮ তম শহর হিসাবে যুক্ত হল তিলোত্তমার নাম। প্রথম পর্যায়ে গুয়াহাটি, শ্রীনগর, বারাণসী, অযোধ্যা, প্রয়াগরাজ, পাটনায় চালু হবে ওয়াটার মেট্রো। তেজপুর এবং ডিব্রুগড়েও চালু হওয়ার কথা ওয়াটার মেট্রো। বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী অধিকারী বলেন, এবার কলকাতাতেও (Kolkata) চালু হবে ওয়াটার মেট্রো। বলে রাখা ভালো, নদী, খাল, হ্রদ বা জলপথ ব্যবহার করে একটি আধুনিক নৌযান হল ওয়াটার মেট্রো। এটি কলকাতা মেট্রোর মতোই সময় ধরে চলাচল করবে। কলকাতা ও হাওড়ায় রয়েছে হুগলি নদী। প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করেন। তাই জলপথে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হলে উপকৃত হবেন বহু যাতায়াতকারী। যন্ত্রচালিত হওয়ায় অতি দ্রুত এক স্থান থেকে অন্যত্র যাতায়াতে সম্ভব। তাই স্বাভাবিকভাবে ওয়াটার মেট্রোর মাধ্যমে যাত্রীরা অতি দ্রুত নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছতে পারবেন। তার উপর আবার এই ওয়াটার মেট্রো পরিবেশবান্ধব। তার ফলে পরিবেশেরও কোনও ক্ষতি হবে না। ভাড়ায় মানুষের নাগালের মধ্যে। তাছাড়া পর্যটনের ক্ষেত্রেও এই ওয়াটার মেট্রো যথেষ্ট আকর্ষণীয়। তাই ওয়াটার মেট্রো চালু হলে কলকাতাবাসী যে যথেষ্ট উপকৃত হবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
সাগরমালায় যুক্ত হবে বাংলা
কেন্দ্রের ‘সাগরমালা ২’ প্রকল্পেও পশ্চিমবঙ্গকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুভেন্দুর সরকার। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘সাগরমালা ১ প্রকল্পে আগের সরকার যুক্ত হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠন করার কথা ছিল। কিন্তু ‘সাগরমালা ২’ আবার শুরু হচ্ছে। আমরা তাতে যুক্ত হব। এই প্রকল্পের একটি প্রস্তাবনা আমরা প্রস্তুত করব। পাঁচ বছরের জন্য ২২৭০০ কোটি টাকার প্রস্তাব তৈরি করা হবে। তাতে বন্দরের যোগাযোগ ব্যবস্থা, উপকূল অঞ্চলে মাছ ধরার পরিকাঠামো, সাগর, কাকদ্বীপ, নামখানা, নয়াচর, খেজুরি থেকে শুরু করে ওড়িশার সীমান্ত পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের কষ্ট দূর করতে উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হবে।’’
৪৪টি নতুন জেটি
শুভেন্দু জানিয়েছেন, ৪৪টি নতুন জেটি তৈরি করা হবে। তার অনুমোদন এত দিন ঝুলে ছিল। তবে সম্প্রতি ৪১টি জেটির জন্য সরকার অনুমোদন পেয়ে গিয়েছে। সেই অনুযায়ী কাজ শুরু হবে। কপিল মুনির আশ্রম এবং সাগর দ্বীপ নিয়ে সার্বিক ভাবে রাজ্য সরকারের যা অনুরোধ ছিল, কেন্দ্র তা মেনে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। গঙ্গাসাগর মেলাকে আন্তর্জাতিক স্তরের মেলায় রূপান্তরিত করতে কেন্দ্রের সব রকম সহযোগিতা পাওয়া যাবে। বলাগড়েও বন্দর যোগাযোগ সংক্রান্ত কাজ এবং ভাঙন রোধের পরিকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হচ্ছে।
কলকাতার সমস্ত ঘাটের সৌন্দর্যায়ন
কলকাতা নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্য সরকারের। শহরের সমস্ত ঘাটের সৌন্দর্যায়ন এবং পুনর্নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। শুভেন্দু জানিয়েছেন, বাগবাজার ঘাট, শোভাবাজার ঘাট, আহিরিটোলা ঘাট, মল্লিকঘাট, বাবুঘাট, রামকৃষ্ণপুর ঘাট, বান্দা ঘাট নিয়ে সরকার কাজ শুরু করেছে। ইতিমধ্যে দু’টি ঘাটের সৌন্দর্যায়নের কাজ শেষ। বাকিগুলির কাজও দ্রুত শেষ করতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। দুর্গাপুজোর মধ্যেই ঘাটগুলির নবীকরণ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে সরকার। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব এবং মা সারদাদেবীর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যকে এই ঘাটগুলির সৌন্দর্যায়নে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হবে।
রাজ্যে পৃথক জাহাজ দফতর
শহরে জমি জবরদখল এবং বিপজ্জনক বাড়িতে বসতি নিয়েও নবান্নের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। শুভেন্দু জানিয়েছেন, পুরসভাকে এই সংক্রান্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। যদি তাঁরা জমি দেন, সরকার আর্থিক ভাবে দুর্বল শ্রেণিকে ঘর বানিয়ে দেবে। এ ছাড়া, কলকাতা বন্দরে অবৈধ সিন্ডিকেট, তোলাবাজি রুখতে এ বার থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ, পুরসভা, পুলিশ, সিআইএসএফ, কাস্টম্স এবং গোয়েন্দা বিভাগ একসঙ্গে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যে পৃথক জাহাজ দফতর তৈরি করতে চায় শুভেন্দুর সরকার। কেন্দ্রের সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। যোগ্য আধিকারিকদের এ বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন শুভেন্দু।

Leave a Reply