তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
ক্রমশ বাড়ছে উদ্বেগ। সদ্যোজাত ও শিশুদের মধ্যে লিভারের রোগের দাপট বাড়ছে। বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি এবং সংক্রামক লিভারের রোগের প্রকোপ বাড়ছে। তাই উদ্বেগ আরও বেশি। ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস ডে-তে তাই চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, সামাজিক সচেতনতার হার না বাড়ালে এবং স্বাস্থ্য সতর্ক না হলে আগামী দিনে আরও বড় বিপদ হতে পারে। তাঁরা আরেকটি মহামারির আশঙ্কা করছেন।
ভারতে ক্রমশ বাড়ছে হেপাটাইটিস রোগের দাপট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং একাধিক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, হেপাটাইটিস আক্রান্তের নিরিখে ভারত বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। গত এক দশকে ভারতে হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি রোগের প্রকোপ বেড়েছে। উল্লেখযোগ্য হারে আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। হেপাটাইটিস এ এবং অন্যান্য হেপাটাইটিস সারিয়ে তোলা সহজ। কিন্তু হেপাটাইটিস বি এবং সি হলো দীর্ঘমেয়াদি রোগ। সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা অনেক বেশি।
মিলিয়েনিয়াম প্রজন্মের টিকাকরণে ঘাটতি বিপদ বাড়িয়েছে?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, ভারতে হেপাটাইটিস বি এবং সি রোগে আক্রান্তের একটা বড় অংশ শিশু এবং সদ্যোজাত। অধিকাংশ আক্রান্ত তার মায়ের শরীর থেকে এই রোগে সংক্রামিত হয়েছেন। আবার অনেকের দীর্ঘদিন পরে রোগ চিহ্নিত হয়েছে। উপসর্গ বিশেষ না থাকায়, তাঁরা স্বাস্থ্য অবহেলা করেছেন। যার ফলে পরবর্তী কালে রোগ আরও জটিল আকার নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাকরণে ঘাটতি ভারতে হেপাটাইটিসের বোঝা বাড়াচ্ছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে ভারতে হেপাটাইটিসের টিকাকরণের হার একদম কম ছিল। এখন যাদের পঁচিশ -তিরিশ বছর বয়স, তাঁদের অনেকেই হেপাটাইটিস বি-র টিকাকরণ হয়নি। এখন গোটা দেশ জুড়ে শিশুদের জন্মের পরে হেপাটাইটিসের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু আগের প্রজন্মের অনেকের এই টিকা দেওয়া হয়নি। এর ফলে, তাদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে। আর হেপাটাইটিস বি এবং সি-র মতো রোগ সহজেই মায়ের শরীর থেকে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে সংক্রামিত হয়। তাই বর্তমানে ভারতে শিশুদের মধ্যে হেপাটাইটিসের দাপট দেখা দিচ্ছে।
পাশপাশি প্রাপ্ত বয়স্কদের টিকাকরণের হার এ দেশে এখনো উল্লেখযোগ্য ভাবে কম। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রাপ্ত বয়স্কদের হেপাটাইটিস টিকাকরণের হার মাত্র ৩ শতাংশ। হেপাটাইটিসের প্রকোপ বাড়ার নেপথ্যে এটাও অন্যতম কারণ বলেই মনে করছেন চিকিৎসকেরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, টিকাকরণের হার না বাড়লে এই রোগের দাপট আটকানো কঠিন হয়ে যাবে।
কীভাবে রোগ নির্ণয় হয়?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, কয়েকটি উপসর্গ সম্পর্কে সজাগ থাকলেই রোগ নির্ণয় সহজ হয়। তাঁরা জানাচ্ছেন, লিভারে এই রোগ সংক্রামিত হলে, বমি ভাব, খিদে কমে যাওয়া, পেটের ডান দিকে ব্যথা হওয়া, ক্লান্তি ভাব দেখা দেবে। এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়। বরং, চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। নির্দিষ্ট উপায়ে রক্ত পরীক্ষা করালে হেপাটাইটিস রোগ চিহ্নিত করা যায়। এর দ্রুত চিকিৎসাও করা যায়। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, হেপাটাইটিস রোগ দীর্ঘমেয়াদি হলে লিভারের কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ চলে যেতে পারে। সিরোসিস হতে পারে। জীবন সংশয় ও দেখা দিতে পারে। তাই এই ধরনের রোগকে একেবারেই অবহেলা করা উচিত নয়।
হেপাটাইটিস বি এবং সি নিয়ে কেন বাড়তি উদ্বেগ?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, হেপাটাইটিস এ সাধারণত জলবাহিত রোগ। বর্ষার মরশুমে এই সংক্রামক রোগের দাপট বাড়ে। দূষিত জল থেকেই এই রোগ হয়। কিন্তু হেপাটাইটিস বি এবং সি আরও বেশি জটিল। এই রোগ একাধিক কারণে হতে পারে। মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে সংক্রামিত হওয়া ছাড়াও, এই রোগ রক্ত এবং যৌন সংস্পর্শ থেকেও ছড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হেপাটাইটিস বি চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এই রোগ কোনো উপসর্গ ছাড়াই দীর্ঘদিন আক্রান্তের শরীরে থাকতে পারে। যখন রোগ নির্ণয় হয়, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। ফলে চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে যায়।
হেপাটাইটিসের দাপট ঠেকাতে কী পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা?
২৮ জুলাই ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস ডে! এই উপলক্ষে দেশ জুড়ে একাধিক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি হেপাটাইটিসের মতো রোগ আটকানোর মূল হাতিয়ার বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ভারতে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর এ দেশে ৫৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস সি রোগে আক্রান্ত হন। ভারতে হেপাটাইটিসের দাপট ঠেকাতে মূল হাতিয়ার টিকাকরণ। এ দেশে হেপাটাইটিস বি এবং সি রোগের দাপট বেড়েছে। তাই লিভারের এই সংক্রামক রোগ ঠেকাতে টিকা করণ জরুরি। শিশুদের টিকা দেওয়ার পাশপাশি প্রাপ্ত বয়স্কদের টিকাকরণে জোর দিতে হবে। তাঁদের পরামর্শ, প্রাপ্ত বয়স্কদের টিকাকরণ না হলে হেপাটাইটিসের এই বোঝা ভারতে বাড়তে পারে। হেপাটাইটিস বি নিঃশব্দে মহামারির আকার নিতে পারে। তাছাড়া লিভার সুস্থ রাখতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাসে জোর দিতে হবে। আবার মদ্যপানের অভ্যাস ছাড়তে হবে। কারণ দেশ জুড়ে মদ্যপানে আসক্তি বাড়ছে। যা লিভারের একাধিক সংক্রমণের কারণ হয়ে উঠছে।

Leave a Reply