মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ‘ক্রেতা সুরক্ষা সপ্তাহ’ কর্মসূচির সূচনাপর্ব থেকে শুরু হয়েছিল অভিযান। ১–৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার বিভিন্ন রেস্তরাঁ ও খাবারের দোকানে খাদ্য সুরক্ষা দফতর অভিযান চালায়। তাতেই সামনে এল চরম সত্য। ইএম বাইপাসের ধারে সিমলা বিরিয়ানি থেকে শুরু করে নাগেরবাজারের আরসালান- কলকাতার ৪০টি রেস্তোরাঁ-হোটেলের লাইসেন্স (KMC Suspend Licenses) বাতিল করল কলকাতা পুরসভা। তার মধ্যে রয়েছে বলরাম মল্লিকের মিষ্টির দোকানও। কেবল বলরাম মল্লিক নয়, একাধিক মিষ্টির দোকানেরও লাইসেন্স সাসপেন্ড করেছে কলকাতা পুরনিগম। কোথাও পচা খাবার, মেয়াদ উত্তীর্ণ মশলা, কোথাও আবার খাবারে বিষাক্ত রং। মিষ্টির দোকানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে তৈরি হত মিষ্টি। বাঙালির প্রিয় মিষ্টিতে ব্যবহৃত দুধেও ছিল ভেজাল।
কী জানাল কলকাতা পুরসভা
কলকাতা পুরসভার প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে জানালেন, বিধিভঙ্গের অভিযোগে ৪০টি খাদ্যবিপণির লাইসেন্স (Trade License Suspend For Food Safety) সাসপেন্ড করা হয়েছে। স্মিতা মঙ্গলবার ডন জিওভানি’স, করিম’স, গিরিশচন্দ্র দে, বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিক, মিষ্টিমুখ, আরসালান, শিমলা ফুড-সহ কয়েকটি নামী রেস্তরাঁ, মিষ্টির দোকান ও খাদ্যবিপণির নাম করেছেন। তবে পুরসভার তরফে যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে পুর কমিশনার উল্লিখিত কয়েকটি নাম অনুপস্থিত। অর্থাৎ লাইসেন্স সাসপেন্ডের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। স্মিতার কথা, ‘‘সরাসরি স্থায়ী ভাবে লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা নেই। দু’সপ্তাহের জন্য লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হয়েছে।’’ তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট রেস্তরাঁ ও খাদ্যবিপণিগুলি খাদ্যসুরক্ষা বিধি নিশ্চিত করার বিষয়ে যত দ্রুত পদক্ষেপ এবং আবেদন করবে, তাঁরাও তত দ্রুত বিষয়টি যাচাই করে লাইসেন্স পুনর্বহাল সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শুরু করবেন।
ফ্রিজের মধ্যে আরশোলা
১–৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার বিভিন্ন রেস্তরাঁ ও খাবারের দোকানে খাদ্য সুরক্ষা দফতরের অভিযানে পচা ও বাসি মাছ-মাংস, ছত্রাক ধরা ছানা ও মিষ্টি, খাবারে নিষিদ্ধ রঙের ব্যবহারের মতো ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে বলে জানান পুর কমিশনার। বিভিন্ন রেস্তরাঁ, মিষ্টির দোকান, বেকারি এমনকি বিভিন্ন নামী শপিং মলের ফুড কোর্টে মিলিয়ে ৫৯২টি ঠিকানায় অভিযানে ১,২২৪ কেজি নিম্নমানের খাবার নষ্ট করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ‘‘মিষ্টির দোকানের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধির লঙ্ঘন চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা ফ্রিজের মধ্যে আরশোলাও পেয়েছি।’’ পুরসভা সূত্রের খবর, হোটেল-রেস্তরাঁর লাইসেন্স সাসপেন্ডের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বেশি করে যে কারণটি উঠে এসেছে, তা হল, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি।
লাইসেন্স সাসপেন্ড হল কাদের
কলকাতা পুরসভার তালিকা থেকে জানা যাচ্ছে, যে সব রেস্তরাঁর লাইসেন্স সাসপেন্ড হয়েছে তাদের তালিকায় রয়েছে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সরণির রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার হসপিটালিটি প্রাইভেট লিমিটেড, লেক ভিউ রোডের এশিয়া হাউস, গোল্ডেন গেট, রামমোহন সরণির দাদা বৌদি হোটেল, পার্ক স্ট্রিটের ডন জিওভিনি’স, মির্জা গালিব স্ট্রিটের করিমস, সল্ট লেকের চৌরাসিয়া চাট, বেনিয়াপুকুরের ‘মেরাকি বেকারি অ্যান্ড কনফেকশনারি’, জেপটো লিমিটেড, শ্রী ব্রজরাজ, এশিয়া হাউস, এফ অ্যান্ড বি মার্কেটিং লিমিটেড (চায়গ্রাম), ডেনজং কিচেন, সোফিয়া হোটেল, ডায়মন্ড পার্কের গঙ্গা, বিরিয়ানি কর্নার, শম্ভু অয়েল মিল, মিস্ট অ্যান্ড মরসেলস প্রভৃতি। পুরসভার কোপে পড়া মিষ্টির দোকানের তালিকায় রয়েছে গিরিশ চন্দ্র দে অ্যান্ড কোং, কালীপুর রোডের শ্রী কৃষ্ণ সুইটস, বিএল সাহা রোডের বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিক, ধাপা রোডের মাতৃ মিষ্টান্ন ভান্ডার, ক্রিস্টোফার রোডের শীতলা মিষ্টান্ন ভান্ডার, মিঠাই ভান্ডার, শক্তি মিষ্টান্ন ভান্ডার ইত্যাদি।
মিষ্টির দোকানে কোথায় সমস্যা
খাবার প্রস্তুতকারী ও পরিবেশনকারীদের বার্ষিক শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রতিষেধক টিকাদানের নথি পাওয়া যায়নি। রেফ্রিজারেটরে রাখা কোনও প্রস্তুত বা অর্ধ-প্রস্তুত খাবারে প্রস্তুতের তারিখের ট্যাগ (Date tag) পাওয়া যায়নি। ব্যবহৃত ভোজ্যতেল ফেলার বা নষ্ট করার বিষয়ে কোনও কাগজপত্র বা নথি পাওয়া যায়নি। ঢাকনাবিহীন আবর্জনার পাত্র (ডাস্টবিন) পাওয়া গেছে। তাপমাত্রা সঠিকভাবে দেখা যায় এমন কোনও ফ্রিজার পাওয়া যায়নি। খাবার প্রস্তুতকারী বা পরিবেশনকারীরা কোনো ধরনের টুপি বা অ্যাপ্রন পরে ছিলেন না। বেশিরভাগ খাবারই খোলা বা ঢাকনাবিহীন অবস্থায় রেক বা ফ্রিজারে রাখা ছিল। রান্নাঘরের বাইরে আলুর সবজি তৈরি হচ্ছিল এবং নিচু জলজ/জলাভূমির সংলগ্ন জায়গায় বস্তায় আলু রাখা ছিল।
তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ
লাইসেন্স বাতিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি করে যে কারণটি উঠে এসেছে, তা হল, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি। আরশোলা, ইঁদুর, পোকামাকড় পাওয়া যাচ্ছে। পচা খাবার রাখা থাকতে দেখা গিয়েছে, ছত্রাকযুক্ত পনির, মাছ-মাংসও পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি, বিভিন্ন জায়গায় কালারিং এজেন্ট ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। দেওয়াল রং করতে ব্যবহৃত কার্সিনোজেনিক ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে মিষ্টির দোকান থেকে বিরিয়ানির রেস্তরাঁ এবং খাবারের হোটেলগুলিতে। এই কার্সিনোজেনিক থেকে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ নিয়ে পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করেছেন রাজ্যের বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনীয়া। তাঁর কথায়, “বিগত দিনের সরকার এসব দেখত না। আমাদের সরকার, জনগণের সরকার। জনগণের স্বাস্থ্য, সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের। সব বিভাগকে বলা রয়েছে, সব হোটেল, রেস্তরাঁর খাবারের গুণমান যাচাই করতে হবে। পানীয় জলের মানদণ্ডও দেখা হবে। যাঁদের উতরোতে পারবেন, থাকবেন। যাঁরা পারবেন না তুলে দেওয়া হবে।”
কীভাবে পুনরায় মিলবে লাইসেন্স
গত কয়েকদিন ধরেই কলকাতার একাধিক রেস্তরাঁ, হোটেল, শপিং মলের ফুড কোর্টে অভিযান চলছিল। অভিযান চালাচ্ছিল রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর, পুরসভাগুলি। কলকাতা পুরসভা সূত্রে খবর, গত সাত দিনে ১৬৭টি রেস্তরাঁ এবং খাবারের হোটেলে হানা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ১৩০০ কেজি খাদ্য সামগ্রী নষ্ট করা হয়েছে, যেগুলি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ৪০টি রেস্তরাঁ এবং খাবারারে দোকানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। সেই তালিকায় একাধিক নামী রেস্তরাঁ রয়েছে। তবে এই লাইসেন্স সাসপেনশন সাময়িক বলে জানা যাচ্ছে। আগামী কাল একটি কর্মশালা হবে। সেখানে সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে সকলকে। তার পর আবার নতুন করে আবেদন জানাতে হবে। তাতে যদি সব ঠিক থাকে, তাহলে ফুড লাইসেন্স দেওয়া হবে আবার।

Leave a Reply