মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশে (Bangladeshi Infiltration) সহায়তার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল টেলিগ্রামভিত্তিক একাধিক অনলাইন নেটওয়ার্ক। এসব টেলিগ্রাম গ্রুপে সীমান্ত পার হওয়ার বিভিন্ন উপায়, স্থানীয় সমাজে মিশে যাওয়ার কৌশল, এমনকি প্রাথমিক হিন্দি ভাষা শেখানোর মতো তথ্যও ভাগ করে নেওয়া হতো। পাশাপাশি, অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের পর কীভাবে নজর এড়িয়ে বসবাস করা যায়, সে সম্পর্কেও নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছিল। সম্প্রতি জাতীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির হাতে উঠে এসেছে এমনই তথ্য। এই নেটওয়ার্কগুলির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে সরকার। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, চলমান অভিযানে ইতিমধ্যেই এমন কয়েকটি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
একাধিক টেলিগ্রাম চ্যানেলের সন্ধান
তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, কিছু টেলিগ্রাম চ্যানেলে “হাউ টু এন্টার ইন্ডিয়া ” (How to Enter India) এবং “হান্ড্রেড ওয়ান ওয়েস টু বাইপাস ইন্ডিয়ান সিকিউরিটি” (101 Ways to Bypass Indian Security)-এর মতো শিরোনামে পোস্ট ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হতো। এখানে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের মতে, এসব গ্রুপ কেবল আলোচনা চালানোর জন্য ছিল না; বরং অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের সীমান্ত পার হওয়া এবং দেশের ভিতরে বসতি গড়ে তুলতে সহায়ক তথ্য সরবরাহ করা হত। এই নেটওয়ার্কের বিস্তার ও কার্যপদ্ধতি খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। একই সঙ্গে, সংগঠিত চক্রগুলি কীভাবে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগের পরামর্শ
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, কয়েকটি গ্রুপে প্রাথমিক হিন্দি ভাষার পাঠ এবং ভারতে প্রবেশের পর স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শও দেওয়া হতো। তদন্তকারীদের ধারণা, এই ধরনের তথ্য অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত মিশে যেতে সাহায্য করেছে। পরিচয় যাচাইয়ের সময় সন্দেহ এড়াতে সহায়তা করার জন্যও প্রচার চালানো হত। নিরাপত্তা সংস্থাগুলি এখন খতিয়ে দেখছে, এই কার্যকলাপের পিছনে সীমান্তপারের সংগঠিত দালালচক্র বা মানব পাচার চক্রের কোনও ভূমিকা রয়েছে কি না। তদন্তে আরও দেখা হচ্ছে, এই টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলির সঙ্গে এমন মধ্যস্থতাকারীদের যোগাযোগ ছিল কি না, যারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের পর যাতায়াত, অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা এবং জাল পরিচয়পত্র সংগ্রহে সহায়তা করত।
ভারতের পূর্ব সীমান্ত-ই প্রবেশ পথ!
পূর্ববর্তী একাধিক পুলিশি তদন্তেও উঠে এসেছিল যে, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা সীমান্ত পার হওয়া এবং দেশের বিভিন্ন অংশে পৌঁছানোর জন্য দালালচক্র ও মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করত। তদন্তকারী সংস্থার মতে, সাম্প্রতিক তথ্য সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরদার করেছে। সরকারি সূত্রের বক্তব্য, ভারতের পূর্ব সীমান্ত দীর্ঘ এবং ভৌগোলিকভাবে জটিল হওয়ায় নজরদারি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সীমান্তে ব্যাপক বেড়া নির্মাণ এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও সংগঠিত চক্রগুলি নানা উপায়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার!
তদন্তে উঠে আসা তথ্যের পর আবারও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও টেলিগ্রাম বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের ব্যবহৃত একটি বৈধ মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ব্যক্তিগত চ্যানেল এবং বৃহৎ গ্রুপ পরিচালনার সুবিধা কখনও কখনও অপরাধচক্রের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তদন্তকারীরা স্পষ্ট করেছেন, তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট চ্যানেলগুলি, যেগুলির বিরুদ্ধে অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে; প্ল্যাটফর্মটির বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে কোনও অভিযোগ করা হচ্ছে না।
নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসেও টেলিগ্রামের ব্যবহার!
আগেও সাময়িকভাবে টেলিগ্রামের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল কেন্দ্র। নিট (NEET-UG) পরীক্ষা নিয়ে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্র। অভিযোগ, টেলিগ্রামের মাধ্যমেই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিভ্রান্তিকর ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’-এর প্রমাণ তৈরির জন্য মেসেজ এডিটিং-এর অপব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ। , কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ভারতীয় সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার (I4C)-এর সাহায্যে টেলিগ্রামে প্রতারণা ও ভুয়ো প্রচারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। এবার দেখা গেল অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরাও টেলিগ্রামের সাহায্য নিচ্ছে।
তদন্তে প্রাপ্ত প্রমাণই চূড়ান্ত
তদন্তকারী সংস্থাগুলি আরও খতিয়ে দেখছে, এই অনলাইন গ্রুপগুলির সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি ভারতে প্রবেশের পর অন্য কোনও বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন কি না। তবে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে, শুধুমাত্র কোনও টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্য হওয়া মানেই অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ নয়। এ ধরনের অভিযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য চলমান তদন্তে প্রাপ্ত প্রমাণই চূড়ান্ত ভিত্তি হবে।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার
এই ঘটনার পর আবারও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আইনের আওতায় থেকে সংগঠিত অনলাইন অপরাধচক্রের ওপর আরও কার্যকর নজরদারি এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির দাবি জোরালো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে সীমান্ত পরিকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি গোয়েন্দা-তথ্যভিত্তিক অভিযান, নথিপত্র যাচাই, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বয় অপরিহার্য।
বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় যাচাই
সরকারি সংস্থাগুলি বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিদেশ মন্ত্রকও জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবৈধভাবে ভারতে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের নাগরিকত্ব যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। টেলিগ্রামভিত্তিক এই কথিত সহায়ক নেটওয়ার্কের তদন্ত এখনও চলছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির লক্ষ্য, এই চ্যানেলগুলির পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করা, নেটওয়ার্কটির প্রকৃত পরিসর নির্ধারণ করা এবং এটি বৃহত্তর কোনও সংগঠিত আন্তঃসীমান্ত অনুপ্রবেশ চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা।

Leave a Reply