মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ফ্রান্সে আয়োজিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে (G7 Summit) যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আগামী ১৫-১৭ জুন আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে সেখানে যোগ দেবেন তিনি। উল্লেখ্য, ফ্রান্সের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে এক বিবৃতিতে এই কথা জানানো হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত বিদেশ মন্ত্রকের তরফে এখনও এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। আগামী ১৫ থেকে ১৭ জুন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হতে চলা জি৭ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদির উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে আরও একবার তুলে ধরবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলির নেতারা এই সম্মেলনে একত্রিত হয়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক সংঘাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করবেন।
ফ্রান্স ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব
দু’দিনের ফ্রান্স সফরে গিয়েছে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তাঁর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে ফ্রান্সের ইউরোপ ও বিদেশ বিষয়ক মন্ত্রী জঁ নোয়েল বারোর। জি৭ বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে তাঁদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। এই বৈঠকেই ফ্রান্সের এভিয়াঁ শহরে অনুষ্ঠিতব্য জি৭ সম্মেলনে মোদির অংশগ্রহণকে স্বাগত জানানো হয়। ফ্রান্সের বিদেশ মন্ত্রক যে বিবৃতি পেশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি (PM Modi) জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে এদিন দুই দেশের দুই মন্ত্রী জি৭-এর কার্যক্রমে ভারতের অবদান বিশেষভাবে তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে কানাডায় জি৭ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন মোদি। মনে করা হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতি, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হবে ওই সম্মেলনে। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, ফ্রান্স ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করা এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের গুরুত্ব বৃদ্ধি
যদিও ভারত জি৭-এর সদস্য নয়, তবুও দেশের অর্থনৈতিক শক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রায়শই তাকে আমন্ত্রিত দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এবারের সম্মেলনেও ভারত বৈশ্বিক অর্থনীতি, সাপ্লাই চেইন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরবে বলে আশা করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা—এই সব বিষয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে যখন একাধিক সংকট—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত এবং জ্বালানি সমস্যা—চলমান, তখন এই ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জি৭ সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভারত তার অবস্থান স্পষ্ট করতে পারবে এবং বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারবে।
পশ্চিম এশিয়া ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে জোর
সম্মেলনের আলোচনায় পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাবে, বলে বিশেষজ্ঞদের মত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ভারত ও ফ্রান্স উভয়েই এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মঞ্চ
প্রসঙ্গত, জি৭ -এর পুরো কথা হল ‘গ্রুপ অফ সেভেন’। এটি বিশ্বের সাতটি উন্নত অর্থনীতির দেশগুলির একটি গোষ্ঠী। এই সাতটি দেশ বছরে একবার মিলিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনা করে। ১৯৭৩ সালে খনিজ তেলের সংকটের কারণে গোটা বিশ্বে অর্থনীতির চাকা স্লথ হয়ে গিয়েছিল। সেই সংকটের মোকাবিলা করতেই জি৭ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল সাতটি দেশ। জি৭ গোষ্ঠীর সদস্য দেশগুলি হল ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, ব্রিটেন, জাপান, আমেরিকা এবং কানাডা। ভারত এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত নয়। নিয়ম অনুযায়ী, আয়োজক দেশ এই গোষ্ঠীর বাইরে থাকা অন্য একটি দেশকে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। সেই সূত্রেই কয়েক বছর ধরে এই বৈঠকে আমন্ত্রণ পেয়ে আসছে ভারত।
জি৭ বৈঠকের আলোচ্য বিষয়!
এই বছর বৈঠকের আলোচ্য বিষয় হল গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা, পারস্পরিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রভৃতি। অর্থনীতি সংক্রান্ত আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যে থাকবে জ্বালানি, খনিজ পদার্থের সরবরাহ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তা। এছাড়াও বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন এবং লিঙ্গসাম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়েও এবারের জি৭ বৈঠকে আলোচনা হবে বলে জানা গিয়েছে। তবে, এই বৈঠকে ইরান ও ইজরায়েলের সংঘাত নিয়ে আলোচনা হবে, বলে অনুমান। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করার জন্য এই গোষ্ঠীর জন্ম হলেও জি৭ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে একাধিকবার সমালোচনারও শিকার হয়েছে গোষ্ঠীটি। এর মূল কারণ হল জিডিপি হ্রাস। বিগত বেশ কিছু বছরে সদস্য দেশগুলির সম্মিলিত জিডিপি হ্রাস পয়েছে। ফলে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হল চিন। তিন নম্বর স্থানে রয়েছে রাশিয়া। অন্যদিকে, জাপানকে কড়া টক্কর দিয়ে চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হওয়ার পথে ভারত। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই তিন দেশই জি৭ গোষ্ঠীর স্থায়ী সদস্য নয়।

Leave a Reply