Siliguri Corridor: শিলিগুড়ি করিডরে নতুন চার লেনের মহাসড়ক, ২,০০০ কোটির বেশি বরাদ্দ কেন্দ্রের

siliguri corridor centre allocates rs 2,000 crore for the highway connecting northeast

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে (Connecting Northeast) মূল ভূখণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল শিলিগুড়ি করিডরকে (Siliguri Corridor) আরও শক্তিশালী করতে বড়সড় পরিকাঠামোগত উদ্যোগ নিল কেন্দ্র। ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত এই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ৩১.০২ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণের জন্য ₹২,০৭৭.১৮ কোটি বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গড়করি বৃহস্পতিবার এক ফেসবুক পোস্টে এই প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেন। নতুন এই মহাসড়কটি বাগডোগরা থেকে পানিট্যাঙ্কি ও খড়িবাড়ি হয়ে বিহারের গলগলিয়া পর্যন্ত যাবে। রাস্তাটির নাম হবে জাতীয় সড়ক ৩২৭ (NH-327)। নতুন মহাসড়কটি বর্তমান এনএইচ-২৭-এর সমান্তরালে, প্রায় ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে নির্মাণ করা হবে। এর ফলে শিলিগুড়ি ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট তৈরি হবে।

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর

প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ শিলিগুড়ি করিডর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের একমাত্র স্থল সংযোগ। এর সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার। একদিকে নেপাল ও বাংলাদেশ এবং অন্যদিকে ভুটান ও চিন সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় এই অঞ্চল দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গড়করি জানান, নতুন প্রকল্পটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের দিকে যাতায়াত ও বাণিজ্যিক সংযোগ উন্নত করবে।

কমবে যানজট, দ্রুত হবে বাণিজ্যিক পরিবহণ

নতুন চার লেনের সড়ক তৈরি হলে বাগডোগরা, নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি ও পানিট্যাঙ্কি এলাকার যানজট অনেকটাই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাগডোগরা বিমানবন্দর এবং উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলির সঙ্গে যোগাযোগ আরও দ্রুত হবে। কৃষি, উদ্যানপালন, চা-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন পণ্য দ্রুত বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই রাস্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। প্রকল্পের আওতায় থাকবে তিনটি বড় সেতু, একটি রোড ওভারব্রিজ, পাঁচটি হাতি চলাচলের আন্ডারপাস এবং রাস্তার দু’পাশে সার্ভিস রোড। বাগডোগরা বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী যাত্রীদের আর যানজটে আটকে উড়ান মিসের আশঙ্কায় ভুগতে হবে না। প্রতিদিন পানিট্যাঙ্কি সীমান্ত দিয়ে নেপালে প্রবেশ করা শত শত পণ্যবাহী ট্রাকের পরিবহণ-সময় এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে যাবে। এর ফলে এলাকার চা-বাগান, ফল, আনারস ও শাকসবজি উৎপাদনকারী কৃষক, উদ্যানপালক, ব্যবসায়ী এবং পর্যটন শিল্প মারাত্মকভাবে উপকৃত হবেন। স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য দ্রুত ও কম খরচে দেশের বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে, যা উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে আরও শক্তিশালী করবে।

হাতির করিডরেও বিশেষ নজর

নতুন মহাসড়কের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল পাঁচটি প্রস্তাবিত এলিফ্যান্ট আন্ডারপাস। এনএইচ-৩২৭ এর যে অংশ কার্শিয়ং বন বিভাগের মধ্য দিয়ে যাবে, সেখানে একাধিক এলাকাকে হাতি পারাপারের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বন দফতরের পক্ষ থেকে মহাসড়কের নিচ দিয়ে হাতি চলাচলের জন্য পৃথক পথ তৈরির দাবি জানানো হয়েছিল। বিশেষ করে ধান কাটার মরসুমে এই এলাকায় হাতির চলাচল বেড়ে যায়। আন্ডারপাস তৈরি হলে দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় হাতির মৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রেল ও বিমান যোগাযোগেও বড় পরিকল্পনা

শুধু সড়ক নয়, সামগ্রিকভাবে শিলিগুড়ি করিডরের পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র। ইতিমধ্যেই বারাণসী থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত উচ্চগতির রেল করিডর এবং শিলিগুড়ির কাছে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ রেলপথ তৈরির পরিকল্পনা সামনে এসেছে। এর পাশাপাশি মালদহ থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত চতুর্থ রেললাইন বসানোর অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। বাগডোগরা বিমানবন্দরের পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি আলিপুরদুয়ারের হাসিমারা থেকে বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। হাসিমারায় ভারতীয় বায়ুসেনার একটি রাফাল স্কোয়াড্রন রয়েছে।

উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়বে

দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা এই প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী নিতিন গডকরি এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, শিলিগুড়ি করিডরের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে এই প্রকল্প শুধুমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। নতুন সড়কপথ তৈরি হলে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে পণ্য, পরিষেবা এবং মানুষের চলাচল আরও দ্রুত ও সহজ হবে। ফলে উত্তরবঙ্গের বাণিজ্য, পর্যটন, কৃষি ও চা-শিল্পেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এনএইচ-২৭-এর পাশাপাশি এনএিচ-৩২৭ তৈরি হলে শিলিগুড়ি করিডরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প সড়কপথ তৈরি হবে। ফলে এই কৌশলগত ‘চিকেনস নেক’-এর যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনই ভবিষ্যতে জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রেও নতুন এই মহাসড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

খুশি সব মহল

পর্যটন মন্ত্রী শংকর ঘোষ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘‘এই সড়ক উত্তরবঙ্গের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে । শিলিগুড়ি করিডরকে সুরক্ষিত ও উন্নত করতে কেন্দ্রীয় সরকার সর্বাত্মকভাবে সচেতন, আর এই নতুন রাস্তা তারই একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’’ পর্যটন শিল্পেও এর ফলে নতুন জোয়ার আসবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন। একই সঙ্গে শিল্প মহলেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ এর উত্তরবঙ্গ আঞ্চলিক শাখার চেয়ারম্যান সতীশ মিত্র বলেন, ‘‘এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ। প্রস্তাবিত শিলিগুড়ি রিং রোড তৈরির এটিই প্রথম ধাপ। চার লেনের সড়ক চালুর ফলে শিলিগুড়ির পরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং অঞ্চলে নতুন শিল্প বিনিয়োগের সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।’’

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share