China: মাও যুগে ফিরছে চিন? রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় নতুন মতবাদ শি জিনপিংয়ের

chinese-president-session-jinping-

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: চিনের (China) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়া এবং চিনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি)-র অভ্যন্তরে চাপ বৃদ্ধির মধ্যেই নতুন একটি রাজনৈতিক-আদর্শিক মতবাদ সামনে আনল বেজিং। ‘শি জিনপিং থট অন পার্টি বিল্ডিং’ (Xi Jinping Thought on Party Building) নামে পরিচিত এই নতুন তত্ত্বকে বিশ্লেষকরা শি জিনপিংয়ের হাতে আরও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। গত ১৫ জুন বেজিংয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় পার্টি-নির্মাণ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মতবাদ উন্মোচন করা হয়। ঘটনাচক্রে দিনটি ছিল চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ৭৩তম জন্মদিন। সাধারণত চিনা নেতাদের ব্যক্তিগত উপলক্ষকে রাষ্ট্রীয় প্রচারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় না, কিন্তু এবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে শি এবং তাঁর জন্মদিনকে অস্বাভাবিকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

‘পার্টিই সর্বেসর্বা’— নতুন প্রচারের মূল বার্তা

সম্মেলনে সিসিপির শীর্ষ নেতারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, চিনের সমস্ত প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সামাজিক কাঠামোর ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বই সর্বোচ্চ। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য এবং শি-ঘনিষ্ঠ নেতা কাই ছি, পাশাপাশি দুর্নীতি দমন সংস্থার প্রধান লি শি। কাই ছি পার্টির কর্মীদের নির্দেশ দেন শি জিনপিংয়ের রচনাবলি ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে নতুন করে অধ্যয়ন শুরু করতে। তিনি ‘টু আপহোল্ডস’ (Two Upholds) নীতির প্রতি আনুগত্যের ওপরও জোর দেন, যার মূল লক্ষ্য শি জিনপিংকে দলের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সিসিপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্ব অটুট রাখা।

নতুন আদর্শিক অভিযানে জোর রাজনৈতিক আনুগত্যে

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শি জিনপিং রাজনৈতিক শিক্ষা, মতাদর্শগত প্রচার এবং পার্টির নজরদারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসা ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত করেছেন। নতুন মতবাদে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পার্টি শৃঙ্খলা, সাংগঠনিক আনুগত্য এবং ‘পার্টিই সবকিছুর নেতৃত্ব দেবে’— এই নীতিকে। যদিও এই ধারণাগুলি দীর্ঘদিন ধরেই সিসিপির অংশ, তবে প্রথমবার এগুলিকে শি জিনপিংয়ের নামে পৃথক ও আনুষ্ঠানিক মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলো। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া একে মার্ক্সবাদী পার্টি-গঠন তত্ত্বে ‘গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অবদান’ বলে উল্লেখ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে মাও সে তুং ও অন্যান্য পূর্বসূরি নেতাদের মতোই শি জিনপিংয়ের রাজনৈতিক দর্শনকে দলীয় মতাদর্শের কেন্দ্রে স্থাপন করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই রাজনৈতিক কড়াকড়ি

চিন বর্তমানে ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী সম্পত্তি খাতের সংকট, দুর্বল ভোক্তা আস্থা এবং জনসংখ্যাগত সমস্যার মুখোমুখি। এই পরিস্থিতিতে বেজিং রাজনৈতিক ঐক্য ও দলীয় শৃঙ্খলা জোরদারে আরও সক্রিয় হয়েছে। সম্মেলনের বার্তায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আনুগত্য এবং শি জিনপিংয়ের প্রতি আনুগত্যকে আলাদা করে দেখা যাবে না।

দেং শিয়াওপিংয়ের সংস্কার যুগ থেকে ভিন্ন পথে চিন?

১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে চিন অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের পথে হাঁটতে শুরু করে। সেই সময়ের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মাও সে তুংয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অস্থিরতা থেকে দেশকে দূরে সরিয়ে স্থিতিশীল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা। কিন্তু শি জিনপিংয়ের আমলে পার্টির প্রভাব আবারও রাষ্ট্র ও সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। নতুন মতবাদ সেই প্রবণতাকেই আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। এ বছর সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরুর ৬০ বছর পূর্তি হওয়ায় নতুন এই আদর্শিক প্রচারের সময়কালও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। রাজনৈতিক অধ্যয়ন, মতাদর্শগত আনুগত্য এবং পার্টির সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের ওপর জোর দেওয়ায় অনেকেই মাও যুগের সঙ্গে তুলনা টানছেন।

শি জিনপিংকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক কাঠামো

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সিসিপি শি জিনপিংয়ের নামকে দলীয় নীতি, শিক্ষা সামগ্রী এবং বিভিন্ন বিধিবিধানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। নতুন মতবাদ সেই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করল। ১৫ জুন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি ‘কমিউনিস্ট পার্টি সদস্য শি জিনপিং’ শিরোনামে ছয় মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে তুলে ধরা হয় যে শি জিনপিংয়ের “প্রথম পরিচয় একজন কমিউনিস্ট পার্টি সদস্য” এবং তাঁর “প্রথম দায়িত্ব পার্টির জন্য কাজ করা”। দেশজুড়ে সরকারি সংস্থা, স্থানীয় পার্টি ইউনিট এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শি জিনপিংয়ের রচনা ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়মিত অধ্যয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২০২৭-এর আগে ক্ষমতার ভিত্তি আরও মজবুত?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৭ সালের সম্ভাব্য নেতৃত্ব পুনর্গঠনের আগে শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারাকে দলীয় কাঠামোর গভীরে প্রোথিত করার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করা হচ্ছে। নতুন মতবাদের মাধ্যমে বেজিং আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে— রাষ্ট্র, সমাজ এবং অন্যান্য সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বে রয়েছে চিনা কমিউনিস্ট পার্টি। আর ‘শি জিনপিং থট অন পার্টি বিল্ডিং’ সেই পার্টি-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থাকেই আরও আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিল।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share