মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ৩৪ বছরের বাম সূর্য অস্ত গিয়েছে। পাটে বসেছে ১৫ বছরের তৃণমূল-ভাস্করও। চলতি বছরই রাজ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে প্রথম বিজেপি সরকারের। তার পরেই এক এক করে খুলে পড়ছে বাম এবং তৃণমূল সরকারের মুখোশ (Taslima Nasreen)। স্রেফ ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতিকে হাতিয়ার করেই কেউ ৩৪, কেউ আবার দিব্যি আরাম-আয়েশ করে ১৫ বছর কাটিয়ে দিয়েছে মহাকরণ এবং তারই পোর্টেবল সংস্করণ নবান্নে (Left Front Govt)। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দাবার বোড়ে করে আদতে আখের গুছিয়ে গিয়েছেন বাম এবং তৃণমূলের ভোট কারবারিরা।
পদ্ম জমানায় কলকাতায় ‘মুক্তমনা’ তসলিমা (Taslima Nasreen)
রাজ্যে পালাবদলের পর সরকার গড়েছে বিজেপি। এই পদ্ম জমানায়ই বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছেন ‘মুক্তমনা’রা। ২০০৭ সালে বাম জমানায় প্রবল আন্দোলনের জেরে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে। ‘দ্বিখণ্ডিত’র জননী বড় দুঃখে ছেড়েছিলেন তাঁর ‘সেকেন্ড হোম’ কলকাতা। ১৯ বছর পর সেই তিনিই ফিরলেন আবারও কলকাতায়। যখন শহর ছেড়েছিলেন, চাক্ষুষ করেছিলেন মৌলবাদীদের দাপাদাপি। আর যখন ফিরলেন, তখন দেখলেন আক্ষরিক অর্থেই একটু একটু করে গড়ে উঠছে সোনার বাংলা। প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে তসলিমা নিজেই বলেছেন, এই শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর। তাঁর প্রত্যাবর্তনের আবহে ফের আলোচনায় এসেছে—কেন ২০০৭ সালে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়েছিল, কীভাবে কলকাতার রাজপথে হিংসাত্মক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সেই পরিস্থিতিতে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকা কী ছিল।
‘লজ্জা’ থেকে নির্বাসন, শুরুটা বাংলাদেশে
তসলিমার নির্বাসনের ইতিহাস অবশ্য কলকাতায় শুরু হয়নি। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার আগে থেকেই তাঁর লেখা নিয়ে মৌলবাদী সংগঠনগুলির তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়েছিল। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের প্রেক্ষাপট উঠে আসে তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘লজ্জা’-য়। বইটি প্রকাশের পর তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তসলিম। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থেকেছেন। কিন্তু মাতৃভাষা ও বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও ছিন্ন হয়নি।
কলকাতায় আশ্রয়, তারপর নতুন সংঘাত
২০০৪ সালে ভারতে থাকার অনুমতি পাওয়ার পর কলকাতায় আসেন তসলিমা। শহরের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিল। কলকাতাকেই তিনি নিজের নতুন ঠিকানা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর লেখা ও বক্তব্যকে ঘিরে বিরোধ থামেনি। ২০০৩ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্বিখণ্ডিত’ পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ করেছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। পরে কলকাতা হাইকোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে বইটি নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে (Taslima Nasreen)।
কলকাতার রাজপথে অশান্তি
২০০৭ সালের ২১ নভেম্বর তসলিমাকে ঘিরে কলকাতায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। অল ইন্ডিয়া মাইনরিটি ফোরামের নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা তসলিমার ভারতে থাকার অনুমতি বাতিল এবং তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলে। বিক্ষোভ দ্রুত হিংসার রূপ নেয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ইটবৃষ্টি, যানবাহনে আগুন এবং পথ অবরোধে স্তব্ধ হয়ে যায় কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা (Left Front Govt)। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত সেনা নামাতে হয়। সে দিন প্রায় ৪০ জন আহত হন, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন পুলিশকর্মী। বহু মানুষকে গ্রেফতার করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছিল। অর্থাৎ, তসলিমাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিক্ষোভ শুধু একটি সাহিত্যিক বা ধর্মীয় বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, বামফ্রন্ট সরকার মৌলবাদী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বদলে তসলিমাকেই সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁদের যুক্তি, একজন লেখিকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার বদলে সরকার বিক্ষোভকারীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছিল। অগত্যা বাংলা ছাড়তে হয় তসলিমাকে।
নিরাপদ আশ্রয় থেকে জয়পুরে, দিল্লিতে
কলকাতার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে তসলিমাকে চলে যেতে হয় জয়পুরে। সেখানেও প্রতিবাদ-আন্দোলন শুরু হয় বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকাকে নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লিতে। যদিও নিরাপত্তাজনিত কারণে দিল্লিতেও তাঁর চলাফেরায় ছিল নানা বিধিনিষেধের বেড়ি। ২০০৮ সালে পরিস্থিতির চাপে তিনি সাময়িকভাবে ভারত ছেড়ে সুইডেনে চলে যান। পরে আবার ভারতে ফিরে এসে দিল্লিতে বসবাস শুরু করেন (Taslima Nasreen)।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
২০০৭ সালের ঘটনায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ভূমিকা আজও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। সমালোচকদের বক্তব্য, নিজেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত এবং মুক্তচিন্তার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরা এক মুখ্যমন্ত্রীর সরকারের কাছ থেকে আরও দৃঢ় অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল। তাঁদের প্রশ্ন—রাজপথে হিংসা ছড়ানো বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে কেন একজন লেখিকাকেই শেষ পর্যন্ত রাজ্য ছাড়তে হল?
‘তুষ্টিকরণের রাজনীতি’
২০০৭ সালের ঘটনার পর থেকেই বামেদের বিরুদ্ধে ‘তোষণের রাজনীতি’র অভিযোগ উঠেছে (Left Front Govt)। সমালোচকদের বক্তব্য, মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও, সরকার সেদিন শেষ পর্যন্ত মৌলবাদী চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছিল। পরবর্তী সময়ে তসলিমা নাসরিনকে ভারতে থাকার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। বিজেপির সমর্থকেরা দাবি করেন, মৌলবাদী হুমকির কাছে নতি স্বীকার না করে তসলিমাকে ভারতে থাকার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের ভূমিকা প্রশংসনীয়। তবে তসলিমার ভারতে থাকা মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া অনুমতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রশাসনিক বিষয়। একে কোনও একটি রাজনৈতিক দলের একক কৃতিত্ব হিসেবে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্ত ও সময়কাল আলাদা করে বিচার করা প্রয়োজন (Taslima Nasreen)।
১৯ বছর পর ফের কলকাতায়
দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে কলকাতায় ফিরেছেন তসলিমা। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন অনুরাগীরা। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই কলকাতায় প্রত্যাবর্তন হয় তাঁর। বিমানবন্দরে পা দিয়েই তসলিমা জানান, কলকাতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এখনও গভীর। তিনি বলেন, এই প্রত্যাবর্তন তাঁর কাছে আবেগের। এমনকি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকলে কলকাতায় আরও বেশি সময় থাকার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একজন নির্বাসিত লেখিকার শহরে ফেরার ঘটনা নয়। ২০০৭ সালের সেই রাত, রাজপথের হিংসা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় মৌলবাদ, প্রশাসনের ভূমিকা (Left Front Govt) এবং অবশ্যই তোষণ-তুষ্টিকরণের রাজনীতি—সব কিছুই আবারও জাগরুক বঙ্গবাসীর স্মৃতিতে (Taslima Nasreen)।

Leave a Reply