মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: সিন্ধু জলচুক্তি (Indus Waters Treaty-IWT) নিয়ে ফের আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (UNSC) বিষয়টি উত্থাপন করে দাবি করেছে, চুক্তি নিয়ে ভারতের পদক্ষেপ আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, পাকিস্তানের এই উদ্যোগ থেকে কোনও বাধ্যতামূলক বা কার্যকর হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তিতেই বিরোধ নিষ্পত্তির একটি সুস্পষ্ট ও বহুপাক্ষিক আইনি কাঠামো রয়েছে। ফলে সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত। অতীতেও সীমান্তবর্তী নদীর জলবণ্টন সংক্রান্ত বিরোধে, যেখানে নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো বিদ্যমান, সেখানে নিরাপত্তা পরিষদ হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থেকেছে।
১৯৬০ সালের চুক্তিতেই বিরোধ মেটানোর পথ
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু জলচুক্তিকে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী জলবণ্টন চুক্তি হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বব্যাঙ্ক চুক্তির কিছু প্রক্রিয়াগত বিষয়ে স্বাক্ষরকারী হলেও, চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ও ধাপে ধাপে এগোনোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথম ধাপে রয়েছে পার্মানেন্ট সিন্ধু কমিশন (PIC), যেখানে দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করার চেষ্টা করে। প্রযুক্তিগত বিষয়ে সমাধান না হলে নিউট্রাল এক্সপার্ট নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। আর জটিল আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিষয়টি কোর্ট অব আরবিট্রেশন-এ নিয়ে যাওয়ার বিধানও রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশ স্বেচ্ছায় এই কাঠামো মেনে চুক্তি স্বাক্ষর করায় বিরোধ মেটানোর প্রধান পথও এটিই। ফলে নিরাপত্তা পরিষদের মতো রাজনৈতিক মঞ্চে বিষয়টি নিয়ে যাওয়ার আইনি ভিত্তি খুবই দুর্বল।
রাষ্ট্রসংঘে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা
পাকিস্তান একাধিকবার রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে চিঠি দিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। ইসলামাবাদের দাবি, ভারতের পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে এবং তাই বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদের আওতায় আনা উচিত। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে এবং ভবিষ্যতের কূটনৈতিক ও আইনি অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রসংঘের পক্ষ থেকে কোনও বাধ্যতামূলক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নেই বলেই মত তাঁদের।
দ্বিপাক্ষিক অবস্থানেই অনড় ভারত
ভারত বরাবরই জানিয়ে এসেছে, সিন্ধু জলচুক্তি সংক্রান্ত সমস্ত বিষয় সম্পূর্ণভাবে দ্বিপাক্ষিক এবং চুক্তির নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই তার সমাধান হওয়া উচিত। নয়াদিল্লির মতে, এই চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পর্যাপ্ত আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। তাই তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ বা আন্তর্জাতিকীকরণের কোনও প্রয়োজন নেই। ভারতের এই অবস্থান তার দীর্ঘদিনের বিদেশনীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলিতে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকার বিরোধিতা করা হয়।
নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কেন কম?
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান দায়িত্ব আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। কিন্তু যেখানে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে, সেখানে সাধারণত নিরাপত্তা পরিষদ সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। উদাহরণ হিসেবে ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম (GERD) সংক্রান্ত বিরোধের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। সেই ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা পরিষদ সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে বিদ্যমান আইনি ও আঞ্চলিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দিয়েছিল। এছাড়া নিরাপত্তা পরিষদে কোনও বাধ্যতামূলক প্রস্তাব পাশ করাতে সদস্য দেশগুলির ব্যাপক সমর্থনের পাশাপাশি স্থায়ী পাঁচ সদস্যের ভেটো এড়ানোও জরুরি। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে এমন ঐকমত্য গড়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
আইসিজিতেও যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিরোধ আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ)-এ পাঠানোর সম্ভাবনাও খুবই কম। কারণ, আইসিজি সাধারণত সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলির সম্মতি ছাড়া কোনও মামলার বিচার করে না। পাশাপাশি সিন্ধু জলচুক্তিতে ইতিমধ্যেই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে আইন বিশেষজ্ঞ ও কূটনৈতিক মহলের মূল্যায়ন, পাকিস্তান রাষ্ট্রসংঘে বিষয়টি তুললেও সিন্ধু জলচুক্তির নির্ধারিত কাঠামোই বিরোধ নিষ্পত্তির প্রধান এবং কার্যকর পথ হিসেবে বহাল থাকবে। নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষে সেই ব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য বা প্রতিস্থাপন করার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় সিন্ধু জলচুক্তিতে স্বাক্ষর করে ভারত ও পাকিস্তান। ঠিক হয়, রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর জল ভারত ব্যবহার করবে। আর সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব নদীর অধিকাংশ জল যাবে পাকিস্তানে। এই জলের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিকাজে ব্যবহার করত পাকিস্তান। পহেলগামে জঙ্গি হামলায় ২৬ জন পর্যটকের মৃত্যুর পরেই সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করে ভারত। তখন থেকেই জল সঙ্কটে ভুগছে পাকিস্তান। এই নিয়ে আগেই ভারতকে নিশানা করেছিল ইসলামাবাদ। সম্প্রতি এই ইস্যুতে ভারতকে ফের আক্রমণ করেছে পাকিস্তান। সিন্ধু জলচুক্তি পুনর্বহালের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা চালাচ্ছে ইসলামাবাদ।

Leave a Reply