মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: স্বাধীনতা দিবসের আগে পশ্চিমবঙ্গে ফের পাক-যোগের সন্দেহে গ্রেফতার এক ব্যক্তি। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ-হাবড়া এলাকা থেকে পাকিস্তানের নাগরিক বলে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (STF)। তদন্তকারীদের দাবি, ওই ব্যক্তি ওয়াহাব আলম ওরফে রানা রউফ/রানা রাউত নামে ভারতে বসবাস করছিল এবং ভুয়ো ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেছিল। প্রাথমিক তদন্তে তার সঙ্গে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর যোগাযোগের সন্দেহও সামনে এসেছে। এই ঘটনায় কলকাতার তপসিয়া থেকে মহম্মদ ইজাজ নামে আরও এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের অনুমান, রানাকে ভুয়ো নথি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল ইজাজ। সূত্রের খবর, বুধবার ভোরে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বনগাঁ এলাকায় অভিযান চালায় এসটিএফ। সেই অভিযানে রানাকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল সে। সেই খবর পাওয়ার পরই সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি বাড়িয়ে তাকে আটক করা হয়।
পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ থেকে নেপাল হয়ে ভারতে?
প্রাথমিক তদন্তে এসটিএফ জানতে পেরেছে, রানা আদতে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের বাসিন্দা। প্রায় ২০১২ সাল নাগাদ নেপাল হয়ে সে বেআইনিভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিল বলে তদন্তকারীদের অনুমান। তবে ভারতে আসার পর কোথায় কোথায় ছিল এবং এর আগে একাধিকবার সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ঢুকেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কলকাতার তপসিয়া এলাকায় বেশ কিছুদিন বসবাস করেছিল রানা। সেখানে ছোটখাটো কাজ করার পাশাপাশি ওয়াহাব আলম নাম ব্যবহার করে আধার কার্ড-সহ একাধিক ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেছিল বলে অভিযোগ। এই ভুয়ো নথি তৈরির ক্ষেত্রে তপসিয়ার বাসিন্দা মহম্মদ ইজাজ তাকে সাহায্য করেছিল বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করছে এসটিএফ। রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ইজাজের নাম সামনে আসে। এরপর তপসিয়া থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারীদের অনুমান, রানা ভারতে নিজের পরিচয় গোপন রেখে থাকতে ইজাজের সাহায্য নিয়েছিল।
পাক সেনা ও আইএসআই-যোগের সন্দেহ
রানার সঙ্গে পাকিস্তানের আইএসআই-এর যোগাযোগ ছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। তদন্তকারীদের একটি সূত্রের দাবি, রানা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে এবং আইএসআই-এর হ্যান্ডলার হিসেবেই নেপাল হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল। তবে এই দাবিগুলির বিষয়ে তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তকারীরা আরও খতিয়ে দেখছেন, ভারতে থাকার সময়ে রানা কার কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত এবং পাকিস্তানে বসে থাকা কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছ থেকে সে নির্দেশ পেত কি না।
ভারতীয় রেল ও সেনার গতিবিধিতে নজর?
রানার বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। তদন্তকারীদের অনুমান, ভারতে থাকার সময়ে সে ভারতীয় রেল এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গতিবিধির উপর নজর রাখছিল। কোন ধরনের তথ্য সে সংগ্রহ করেছিল, সেই তথ্য কোথাও পাঠানো হয়েছিল কি না এবং এর পিছনে কোনও নির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক কাজ করছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে এসটিএফ। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বাংলাদেশের দিকে পালানোর চেষ্টা কেন করছিল রানা, বাংলাদেশে তার জন্য কেউ অপেক্ষা করছিল কি না এবং সীমান্তের ওপারে কোনও যোগাযোগ ছিল কি না—এই প্রশ্নগুলিও তদন্তের আওতায় এসেছে।
হামিম মণ্ডল গ্রেফতারের পরই নতুন সূত্র
রানাকে গ্রেফতারের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। এর আগে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে জঙ্গি-যোগের সন্দেহে হামিম মণ্ডল নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছিল এসটিএফ। হামিমের কাছ থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভিআইপি গতিবিধি, রুট ম্যাপ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি উদ্ধার হয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি।তদন্তে উঠে আসে, হামিমের যোগাযোগ ছিল আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ (JeM)-এর সঙ্গে। তাকে পুলওয়ামা হামলার অন্যতম মূলচক্রী সাজ্জাদ ভাটের ঘনিষ্ঠ বলেও দাবি করেছে তদন্তকারী সূত্র। বর্ধমানে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার আগে হামিম কলকাতার নিউটাউন এলাকায় থাকত বলে তদন্তে জানা যায়। তার সূত্র ধরেই এসটিএফ পরে তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী অর্পিতা সরকার এবং আদিত্য সিং ওরফে রাজ-কেও গ্রেফতার করে।
অর্পিতাকে ‘হানিট্র্যাপ’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ
তদন্তকারীদের দাবি, হামিমের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র ধরে অর্পিতার পাকিস্তান-যোগও সামনে আসে। পাকিস্তানের বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং কুখ্যাত গ্যাংস্টার শাহজাদ ভাট্টির গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ। অর্পিতাকে ‘হানিট্র্যাপ’ হিসেবে ব্যবহার করে নেতা, মন্ত্রী এবং আমলাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলেও তদন্তকারীদের দাবি। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে যোগাযোগ করা হত বলে জানা গিয়েছে। তবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বাস্তবে কোনও অপহরণ বা নাশকতার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সেই কারণে অর্পিতার যোগাযোগ এবং পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য খতিয়ে দেখছে এসটিএফ।
একই নেটওয়ার্কের যোগসূত্র খুঁজছে এসটিএফ
রানা-ইজাজ গ্রেফতারের পর তদন্তকারীদের সামনে এখন একাধিক প্রশ্ন। পাকিস্তান থেকে বেআইনি ভাবে ভারতে ঢোকার পর রানা কীভাবে এত বছর ধরে নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিল? কে তাকে ভুয়ো নথি তৈরিতে সাহায্য করেছিল? ভারতীয় রেল ও সেনার গতিবিধি সম্পর্কে সে কী তথ্য সংগ্রহ করেছিল? সেই তথ্য কোথায় পাঠানো হত? আর বাংলাদেশে পালানোর পরিকল্পনার পিছনে কারা ছিল? এর পাশাপাশি হামিম মণ্ডল, অর্পিতা সরকার, আদিত্য সিংহ এবং নতুন করে গ্রেফতার হওয়া রানা ও ইজাজের মধ্যে কোনও সরাসরি বা পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ, একের পর এক গ্রেফতারের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে সক্রিয় সন্দেহভাজন পাক-যোগ এবং জঙ্গি নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য চক্রটি আরও বড় আকার নিচ্ছে। এসটিএফ এখন এই সমস্ত সূত্রকে এক জায়গায় এনে পাকিস্তান, আইএসআই, জঙ্গি সংগঠন, ভুয়ো পরিচয়পত্র, সীমান্তপথ এবং পশ্চিমবঙ্গে সম্ভাব্য নাশকতার পরিকল্পনার মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটাই খুঁজে দেখছে।

Leave a Reply