মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার সকালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কেঁপে উঠল বীরভূমের তারাপীঠ। মন্দিরের অদূরে পাঁচতলা একটি হোটেলে আগুন লেগে অন্তত ৬ জন পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর। মৃতদের মধ্যে কেউ আগুনে পুড়ে এবং কেউ ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। গুরুতর জখম হয়েছেন বেশ কয়েকজন। তাঁদের উদ্ধার করে রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার হওয়ায় এ দিন সকাল থেকেই তারাপীঠে পুণ্যার্থীদের ভিড় ছিল। বহু মানুষ পুজো দিতে এসে বিভিন্ন হোটেলে উঠেছিলেন। তার মধ্যেই ভোরের দিকে ঘটে যায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
ভোরে হঠাৎ আগুন, ঘন কালো ধোঁয়ায় আতঙ্ক
তারাপীঠ থানার কাছেই পুকুরপাড়ে রয়েছে ‘বিদেশিনী’ নামে পাঁচতলা হোটেলটি। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ হোটেলের বিদ্যুৎ সরবরাহের এনসিবি হঠাৎ ফেটে যায়। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিক ভাবে অনুমান করা হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে হোটেলের নিচের অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ঘন কালো ধোঁয়া। সেই সময় হোটেলের অধিকাংশ আবাসিকই ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে শিশু ও পুণ্যার্থীরাও ছিলেন। আচমকা ধোঁয়ায় ঘর ও সিঁড়ি ভরে যাওয়ায় অনেকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আটকে পড়েন। আতঙ্কে হোটেলের ভিতরে শুরু হয়ে যায় হুড়োহুড়ি।
প্রাণ বাঁচাতে বেরোতে গিয়ে বিপত্তি
হোটেল মালিক কল্যাণ পাল জানান, আগুন লাগার পর রাতপাহারার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা দ্রুত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ব্যবহার করেন এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। কিন্তু ততক্ষণে হোটেলের সাজসজ্জায় ব্যবহৃত ফাইবারের সামগ্রীতে আগুন ধরে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কল্যাণ পাল বলেন, ‘‘আমাদের এখানে রাতপাহারার দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা উঠে সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র সচল করেন। বিদ্যুৎ সরবরাহের তার খুলে দেন। কিন্তু তত ক্ষণে হোটেলসজ্জার সঙ্গে ফাইবারের যে জিনিসপত্র ছিল, তাতে আগুন ধরে যায়। আগুনটা আরও বেড়ে যায়।’’ তাঁর দাবি, দমকলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ততক্ষণে ধোঁয়া হোটেলের উপরতলাগুলিতেও পৌঁছে যায়। ঘর ও সিঁড়ি ঘন কালো ধোঁয়ায় ভরে যাওয়ায় আতঙ্কে আবাসিকেরা বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করেন। হোটেল মালিক আরও বলেন, ‘‘হঠাৎই ঘর ও সিঁড়ি ঘন কালো ধোঁয়ায় ভরে গেলে আবাসিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সবাই প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন। আতঙ্কে ঘর থেকে আবাসিকেরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন। তাঁরা বাইরে আগুনের মধ্যে পড়ে যান। অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। পিছন দিক দিয়ে বেরোনোর দরজা রয়েছে। কিন্তু সেটা অনেকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তাঁরা রিসেপশন দিয়ে বেরোতে শুরু করেন। তখনই অনেকে ঝলসে যান।’’
উপরতলাতেও আটকে ছিলেন অনেকে
আগুন মূলত হোটেলের নিচের অংশে ছড়িয়ে পড়ায় উপরতলার আবাসিকদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়। নিচে আগুন থাকায় তাঁদের অনেকেই নিরাপদে বেরোতে পারেননি। আতঙ্কে কয়েকজন উপর থেকে জিনিসপত্র নিচে ফেলতে শুরু করেন। তবে প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, উপরতলায় থাকা আবাসিকদের মধ্যে বড় ধরনের আঘাতের খবর নেই।
দ্রুত ঘটনাস্থলে পুলিশ ও দমকল
হোটেলটি তারাপীঠ থানার কাছেই হওয়ায় খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। তারাপীঠ থানার পাশাপাশি রামপুরহাট থানার পুলিশও উদ্ধারকাজে যোগ দেয়। খবর পেয়ে দমকলের কর্মীরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। হোটেলের ভিতর থেকে আবাসিকদের একে একে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসা হয়। আগুনে দগ্ধ এবং ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া ব্যক্তিদের দ্রুত রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁদের চিকিৎসা চলছে। শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবারে তারাপীঠে যখন পুণ্যার্থীদের ভিড় তুঙ্গে, তখনই এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এবং হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। উদ্ধারকাজ ও চিকিৎসা চলার পাশাপাশি মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ে কি না, সে দিকেও নজর রয়েছে প্রশাসনের।

Leave a Reply