মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মহাকাশ গবেষণা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতের শীর্ষ জায়ান্ট ‘স্পেসএক্স’ (SpaceX) বিশ্ব শেয়ার বাজারে তাদের প্রথম পা রেখেই এক ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি করেছে। বৃহস্পতিবার ইতিহাসের বৃহত্তম ‘আইপিও’ (Initial Public Offering) বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব সম্পন্ন করে নাসদাক (Nasdaq) এবং নাসদাক টেক্সাসে এসপিসিএস্ক (SPCX) টিকারে তালিকাভুক্ত হয়েছে ইলন মাস্কের এই প্রতিষ্ঠানটি।
শেয়ারের দাম ২২ শতাংশেরও বেশি বেড়ে ১৬৫ ডলারে পৌঁছায় (Elon Musk)
আইপিও-তে প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩৫ ডলার। এর মাধ্যমে রেকর্ড ৭৫ বিলিয়ন ডলার পুঁজি সংগ্রহ করে স্পেসএক্স (SpaceX), যার ফলে শুরুতেই কোম্পানির মোট বাজার মূল্যায়ন দাঁড়ায় প্রায় ১.৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার।
শুক্রবার সকালে বাজার খোলার পর থেকেই স্পেসএক্সের শেয়ারের ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়। প্রথম দিনেই শেয়ারের দাম ২২ শতাংশেরও বেশি বেড়ে ১৬৫ ডলারে পৌঁছায়। এর ফলে কোম্পানির সামগ্রিক বাজার মূল্য ২ ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়, যা বিশ্বের একাধিক বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। আর এই অভাবনীয় সাফল্যের হাত ধরেই স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক (Elon Musk) বিশ্বের প্রথম অফিশিয়াল ‘ট্রিলিয়নেয়ার’ (১ লাখ কোটি ডলারের মালিক) হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখালেন।
শুক্রবার সকালে শেয়ার বাজারের উদ্বোধনী ঘণ্টা বাজিয়ে এই ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা করেন ইলন মাস্ক এবং স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট ও সিওও (COO) গোয়েন শটওয়েল। এ সময় মাস্ক টেক্সাস থেকে এবং শটওয়েল নিউ ইয়র্কের নাসদাক কেন্দ্র থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন।
মোট রাজস্ব আয় ১৮.৭ বিলিয়ন ডলার
২০০২ সালে যখন স্পেসএক্স যাত্রা শুরু করেছিল, তখন মানবজাতিকে বহু-গ্রহের বাসিন্দা (multiplanetary) করার স্বপ্নকে অনেকেই দুঃসাহসিক বা অসম্ভব বলে মনে করেছিলেন। গত দুই দশকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরি, লাখ লাখ গ্রাহকের কাছে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া এবং মার্কিন সরকারের লাভজনক সব চুক্তি হাতিয়ে নিয়ে মহাকাশ শিল্পকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে এই সংস্থা (Elon Musk)। যদিও সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকগুলোতে কোম্পানিটি কিছুটা পরিচালন লোকসানের মুখোমুখি হয়েছিল, তবুও মূলত স্টারলিংক এবং রকেট উৎক্ষেপণ সেবার অভাবনীয় বৃদ্ধির ওপর ভর করে গত বছর তাদের মোট রাজস্ব আয় ১৮.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
দ্বিতীয় শীর্ষ ধনীর তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি সম্পত্তির মালিক মাস্ক
১২ জুন শেয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হতেই ইলন মাস্কের সম্পদ এক ধাক্কায় ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে। স্পেসএক্সের (SpaceX) সিংহভাগ মালিকানার পাশাপাশি টেসলা এবং অন্যান্য লাভজনক সংস্থায় মাস্কের যে শেয়ার রয়েছে, তা মিলিয়ে বর্তমানে কাগজে-কলমে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। এই বিশাল অঙ্কের সম্পদ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির (GDP) চেয়েও বেশি। বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী গুগলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ যার সম্পদ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে মাস্ক (Elon Musk) এখন দ্বিতীয় শীর্ষ ধনীর তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি সম্পদের মালিক।
মঙ্গলে মানব অভিযান ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি প্রধান উদ্দেশ্য
আন্তর্জাতিক বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডের তুমুল আগ্রহের কারণেই স্পেসএক্সের আইপিও এতটা সফল হয়েছে। কোম্পানির শেয়ারের আবেদন বা সাবস্ক্রিপশন নির্ধারিত সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ছিল। এই লিস্টিংয়ের ফলে স্পেসএক্সের শুরুর দিকের কর্মকর্তা ও কর্মীরাও বিপুল আর্থিক রিটার্ন পেতে চলেছেন, যা কোম্পানির ভেতরেই হাজার হাজার নতুন মিলিওনেয়ার তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ইলন মাস্কের (Elon Musk) লক্ষ্য কেবল বাণিজ্যিক মুনাফায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, “মঙ্গলে মানব অভিযান এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির আরও আধুনিকায়নের জন্য বিপুল পুঁজি সংগ্রহ করতেই স্পেসএক্সকে শেয়ার বাজারে আনা হয়েছে। আগামী দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য মহাকাশের কক্ষপথে ১ লাখেরও বেশি স্যাটেলাইট স্থাপন এবং মহাশূন্যেই ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ডেটা সেন্টার’ গড়ে তোলার মতো বড় সব পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ায় একদিকে যেমন স্পেসএক্সের (SpaceX) তহবিল শক্তিশালী হলো, অন্যদিকে পাবলিক কোম্পানি হিসেবে এখন থেকে তাদের ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও অনেক বৃদ্ধি পাবে।

Leave a Reply