FIFA World Cup 2026: শেষ ১৩ মিনিটের মেসি-ঝড়! বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ সুইৎজারল্যান্ড, লড়াই করে হার মিশরের

fifa world cup 2026 lionel mesi's argentina beats egypt they face switzerland in quaterfinal

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: গ্যালারিতে থাকা সমর্থকেরা কাঁদতে শুরু করেছিলেন। ধারাভাষ্যকারেরা বলছিলেন, মেসিকে আর ১৫ মিনিটের জন্য বিশ্বকাপে দেখা যাবে। ঠিক তখনই লাউতারো মার্তিনেজকে নামালেন স্কালোনি। মেসিও সরে গেলেন একেবারে ডান প্রান্তে। বক্সের মধ্যে লোক বাড়াতে গিয়ে মেসিকে ছেড়ে দিল মিশরের রক্ষণ। সেরাদের জন্য ওই টুকুই যথেষ্ট। শুরু হল মেসি-ম্যাজিক (Lionel Messi)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কোনও দিন ০-২ পিছিয়ে থেকে খেলা জেতেনি আর্জেন্টিনা। এমনকি, ড্র পর্যন্ত করেনি তারা। সে দিক থেকে দেখতে গেলে এটা আর্জেন্টিনার সেরা প্রত্যাবর্তন। শেষ ১৩ মিনিটের মেসি-ঝড়ে ০-২ পিছিয়ে থাকা ম্যাচ ৩-২ জিতে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। মিশরের পিরামিডের নীচে চাপা পড়ে যাওয়া আর্জেন্টিনাকে টেনে তুললেন মেসিই। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ সুইৎজারল্যান্ড।

১৩ মিনিটের ঝর আর্জেন্টিনার

আক্রমণ, মাঝমাঠ থেকে রক্ষণ, এদিন বার বার ভুল করেছে আর্জেন্টিনা। মিশরের বিরুদ্ধে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল এক সময়। কিন্তু ১৩ মিনিটের ঝরে হারের মুখ থেকে জয় ছিনিয়ে এনেছে মেসির আর্জেন্টিনা। বিতর্ক থাকবে। ফাউল থেকে মিশরের গোল বাতিল, কিন্তু ম্যাচের শেষ ১৩ মিনিট যে মেসির ছিল, তা অতিবড় সমালোচকও মানবেন। ওই ১৩ মিনিটে লিয়োনেল মেসি ঢেকে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার সব ত্রুটি। ৭৯ মিনিট। ডান প্রান্ত থেকে বক্সে ক্রস বাড়ালেন মেসি। হেডে গোল করে আর্জেন্টিনার সেরা প্রত্যাবর্তনের শুরুটা করলেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। চার মিনিট পর গোল করার দায়িত্ব মেসি নিজেই নিলেন। তাঁর ক্রসে যে আক্রমণ শুরু, তা শেষ হল তাঁর পায়েই। ফিরতি বলে জোরালো শটে জাল কাঁপিয়ে দিলেন তিনি। দেখে মনে হচ্ছিল খেলা অতিরিক্ত সময়ে এগোচ্ছে। ঠিক তখনই ডান প্রান্ত থেকে লাউতারো মার্তিনেজের ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোল করলেন এঞ্জো ফের্নান্দেজ।

কেন এখনও দলের ভরসা মেসি

আরও এক বার দলের রক্ষাকর্তা হয়ে দেখা দিলেন মেসি। হ্যাঁ, তিনি আবার সহজ পেনাল্টি ফস্কেছেন। চলতি বিশ্বকাপে দ্বিতীয়। হ্যাঁ, তাঁর ফ্রি কিক পোস্টে লেগে বেরিয়ে গিয়েছে। হ্যাঁ, ৭২ মিনিট পর্যন্ত তিন মার্কারের দাপটে মিশরের বক্সে ঢুকতে পারছিলেন না তিনি। সেই মেসিই ৭৩ মিনিট থেকে ডান প্রান্তে সরে গেলেন। ব্যস, সেখানেই শেষ মিশর। জায়গা তৈরি করলেন নিজের জন্য। গোল করালেন। গোল করলেন। এই ম্যাচেও আর্জেন্টিনার সেরা খেলোয়াড় তিনিই। আর সেই কারণেই অসাধ্যসাধনের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি। অঝোরে কেঁদেছেন। সতীর্থদের জড়িয়ে ধরেছেন। সতীর্থেরা তাঁকে ঘাড়ে তুলে লাফিয়েছেন। মেসির কান্না বুঝিয়েছে, কতটা চাপে ছিলেন তিনি। সতীর্থদের উল্লাস বুঝিয়েছে, মেসি না থাকলে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যেত তাঁদের। শুরু থেকে ধীরে চলো নীতি নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এত স্লো বিল্ড আপে মিশরের মতো গতিশীল দলকে চাপে রাখা মুশকিল। সেটাই হল এদিন। ডান প্রান্ত থেকে ভেসে আসা হাসানের ক্রসে হেডে গোল করে মিশরকে প্রথমেই এগিয়ে দিলেন ইব্রাহিম। তারপরেই গোল জিকোর। ম্যাচের ৭৫ মিনিট পর্যন্ত মাঠে দাপট ছিল মিশরেরই।

মিশরের প্রতিবাদ, বিস্ফোরক অভিযোগ হাসানের

আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে দু’গোলে এগিয়ে গিয়েও বিশ্বকাপে হেরে গিয়েছে মিশর। বিদায় নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন দলের কোচের হোসাম হাসান। জানালেন, মেসিকে বিশ্বকাপে টিকিয়ে রাখতেই তাঁদের জোর করে হারানো হয়েছে। প্রতারণা করা হয়েছে তাঁদের সঙ্গে। হাসান বলেন, “ফেয়ার প্লে-কে কোনও রকম সম্মান দেখানোই হল না। পেনাল্টি বাতিল করে দেওয়া হল। ভার-ও পরীক্ষা করার প্রয়োজন মনে করল না। দ্বিতীয় গোল অদ্ভুত ভাবে বাতিল করা হয়েছে। সেখানেও ভার পরীক্ষা করা হয়নি। অথচ আমরা সবাই দেখেছিলাম কী ভাবে পিছন থেকে জার্সি ধরে টানা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “রেফারি ভাল ছিলেন না। অবিচার করেছেন আমাদের সঙ্গে। শুরু থেকে আমাদের বিরুদ্ধে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। উনি চাননি আমরা জিতি। এই ম্যাচ চুরি করা হয়েছে। আমাদের দোষ ছিল না।” মেসিকে বিশ্বকাপে টিকিয়ে রাখতে বা বিশ্বকাপ জেতাতেই ফিফা এই কাজ করছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাসান। তাঁর কথায়, “ওরা বোধহয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে চায়। হয়তো চায় মেসি আরও কিছু ক্ষণ খেলুক। ফুটবলে কিছু বাইরের শক্তিও রয়েছে যাদের সামনে কৌশলগত বুদ্ধি কাজে লাগে না। আর্জেন্টিনা সমস্ত বিভাগে ফিফার সাহায্য পাচ্ছে।”

পেনাল্টি মিস, লজ্জার নজিরও মেসির

তিনি গোল করছেন। গোল করাচ্ছেন। প্রতি ম্যাচে নেমে একের পর এক রেকর্ড ভাঙছেন। কিন্তু পাশাপাশি একটি লজ্জার রেকর্ডও গড়েছেন মেসি। বিশ্বকাপে এই রেকর্ড আর কারও নেই। বার বার একটি ভুল করছেন তিনি। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি ফস্কেছেন মেসি। মিশরের বিরুদ্ধে ২১ মিনিটের মাথায় নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকোকে বক্সের মধ্যে মিশরের ডিফেন্ডার ফাউল করায় পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। স্পট থেকে জঘন্য শট মারেন মেসি। গোলরক্ষকের বাঁ দিক দিয়ে গোল করার চেষ্টা করেন তিনি। সেই শট সহজে বাঁচিয়ে দেন মিশরের গোলরক্ষক মুস্তাফা বোশের। গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধেও পেনাল্টি ফস্কেছিলেন মেসি। সে বারও গোলরক্ষকের বাঁ দিক দিয়ে গোল করতে গিয়ে বাইরে মেরে বসেন মেসি। এর আগে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে আইসল্যান্ড ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে পেনাল্টি ফস্কেছিলেন মেসি।

বিশ্বকাপে টানা ন’ম্যাচে গোলের নজির

গত বার থেকে ধরলে বিশ্বকাপে টানা ন’ম্যাচে গোল করলেন মেসি, যে রেকর্ড কারও নেই। বিশ্বকাপের সর্বাধিক গোলের সংখ্যায় কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে ফারাক বাড়ালেন মেসি। তাঁর গোলের সংখ্যা ২১। এমবাপের ১৯। চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলও মেসির। ৮টি গোল করেছেন তিনি। চলতি বিশ্বকাপের সব ম্যাচে গোল করেছেন মেসি। কোয়ার্টার ফাইনালে লিয়োনেল মেসিদের প্রতিপক্ষ সুইৎজারল্যান্ড। এদিন কলম্বিয়া-সুইৎজারল্যান্ডের রাউন্ড অফ ১৬-র ম্যাচের নিষ্পত্তি হল টাইব্রেকারে। অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত গোল করতে পারেনি কোনও দলই। সুইৎজারল্যান্ড এবং কলম্বিয়া দু’দলই রক্ষণ আগলে আক্রমণে ওঠার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিল। আক্রমণ-প্রতি আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচে দু’দলই বেশ কিছু গোলের সুযোগ নষ্ট করেছে। স্ট্রাইকারদের ব্যর্থতাই ম্যাচ টেনে নিয়ে গিয়েছে টাইব্রেকার পর্যন্ত। প্রায় সমানে সমানে লড়াই হলেও কলম্বিয়ার দাপট তুলনায় বেশি ছিল। কিন্তু ভাগ্য লিখেছিল অন্য কথা। টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে সুইৎজারল্যান্ডের কাছে হার মানতে হল কলম্বিয়াকে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share