মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আদানির পর আম্বানি, রাজ্যে শিল্প ফেরাতে সক্রিয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যে নতুন শিল্প এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে মরিয়া ডাবল ইঞ্জিন সরকার। বুধবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের রূপরেখা নিয়ে বিশদে জানালেন শুভেন্দু (Suvendu Adhikari)। রাজ্যে কত বিনিয়োগ আসছে, তার চেয়েও কর্মসংস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে অতীতে সিপিএম এবং গত পনেরো বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে জমে থাকা জট বা ‘ব্যাকলগ’ কাটিয়ে নতুন পথে হাঁটার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
রাজ্যে বিনিয়োগে আগ্রহী আম্বানি
রাজ্যে পাঁচ-ছ’টি ক্ষেত্রে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মুকেশ অম্বানির রিলায়্যান্স গোষ্ঠী। বুধবার কলকাতার মেলাপ্রাঙ্গণে শিল্পের জন্য জমি বিতরণ অনুষ্ঠানে এমনটাই জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘অম্বানিরা রাজ্যে পাঁচ-ছ’টি ক্ষেত্রে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং শীঘ্রই তাদের একটি প্রতিনিধিদল রাজ্যে আসতে পারে।’’ উল্লেখ্য, সোমবার মুম্বইতে অম্বানিদের বাসভবন ‘অ্যান্টিলিয়া’য় গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। যোগ দেন তাঁদের বাড়ির গণেশপুজোয়। পরে মুকেশ অম্বানির সঙ্গে নৈশভোজও সারেন।
রাজ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ!
বুধবার রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে বার্তা দিয়ে শিল্পপতিদের পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘৩৩টি শিল্পসংস্থার হাতে শিল্পজমির বরাদ্দপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, এই প্রকল্পগুলিতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হতে পারে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রায় ৬২ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।’’ বিনিয়োগ টানার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ওপর যে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে, সেকথা স্পষ্ট করে দিয়ে শুভেন্দু বলেন, “আমার ভাবনা হচ্ছে যে কত ইনভেস্টমেন্ট করলেন সেটা বড় কথা নয়, কত এমপ্লয়মেন্ট দিলেন তার উপরে আমরা গুরুত্ব দিতে চাই।”
রাজ্যে শিল্পস্থাপনের সহায়ক পরিবেশ
শুভেন্দু আরও বলেন, ‘‘রাজ্যে শিল্পস্থাপনের ক্ষেত্রে কোনওরকম হুমকি বা তোলাবাজির অভিযোগ উঠলে সরাসরি সরকারকে জানানো যাবে।’’ এ জন্য টোল-ফ্রি নম্বর চালু করা হয়েছে। কোথাও কেউ হুমকি দিলে বা তোলাবাজির চেষ্টা করলে ওই নম্বরে অভিযোগ জানালে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে বলেও আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘‘রাজ্যে বিনিয়োগ টানতে প্রশাসনিক সহায়তার পাশাপাশি শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।’’ নতুন শিল্প প্রকল্প এলে স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পরিষেবা, পরিবহণ, সরবরাহ এবং ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে বলে প্রশাসনের তরফে আশা করা হচ্ছে।
শিল্পক্ষেত্রের জন্য জমি বরাদ্দ
এদিন সরকারের তরফে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রের জন্য জমি বরাদ্দের কথা জানানো হয়। তার মধ্যে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা, সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ওষুধ, ইস্পাত, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বস্ত্রশিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। রাজ্যের বিভিন্ন শিল্প পার্কে এই জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। হরিণঘাটা, খড়্গপুর, পানাগড়, রঘুনাথপুর, ফলতা, উলুবেড়িয়া, কল্যাণী, নৈহাটি, কোচবিহার, সল্টলেক এবং অঙ্কুরহাটি-সহ একাধিক শিল্পাঞ্চলের নামও অনুষ্ঠানের প্রচারপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিল্পায়নের লক্ষ্যেই ওয়েস্ট বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের বিভিন্ন শিল্প পার্কে এই জমি দেওয়া হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, জমি বরাদ্দের মাধ্যমে বিনিয়োগের প্রস্তাবগুলিকে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যাওয়া হবে।
বাম ও তৃণমূল সরকারের সমালোচনা
শিল্পনীতি নিয়ে এ দিন পূর্বতন বাম ও তৃণমূল সরকারের সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বাম আমলে শিল্পায়নের চেষ্টা থাকলেও দলের অবস্থান ছিল নেতিবাচক। তাঁর আরও বক্তব্য, তৃণমূল সরকারের আমলে জমি নীতির কারণে শিল্পের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছিল এবং সিঙ্গুর থেকে টাটাদের চলে যাওয়ার প্রসঙ্গও তিনি তোলেন। পূর্বতন সরকারের শিল্পনীতির সমালোচনা করে শুভেন্দু বলেন, ‘‘আগের সরকারে ‘ইনসেন্টিভ’ বা বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যত গুরুত্ব পায়নি। বর্তমান সরকার শিল্পে উৎসাহ দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল তৈরি করেছে।’’ রাজ্যের নতুন খসড়া শিল্প নীতি (Draft Industrial Policy) প্রসঙ্গে তিনি জানান, এই নীতিতে ইনসেন্টিভ বা উৎসাহভাতার বিশেষ সংস্থান রাখা হয়েছে। এই প্রস্তাবিত খসড়াটি ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্যসচিবের (CS) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। মুখ্যসচিব নিজের দফতরের সমস্ত হেড অফ ডিপার্টমেন্টদের নিয়ে তা খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে ক্যাবিনেটে পেশ করবেন। এরপর মন্ত্রিগোষ্ঠীর চূড়ান্ত অনুমোদনের পরেই তা কার্যকর হবে। তবে পূর্বের শাসনকালগুলির অর্থনৈতিক স্থবিরতা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিতেও ছাড়েননি তিনি। শুভেন্দু অধিকারীর কড়া মন্তব্য, অতীতে সিপিএম আমল এবং বিগত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের জমানায় অর্থনীতির বেহাল দশা হয়েছে। সেই পুরনো জমানার জঞ্জাল বা ব্যাকলগের বোঝা আর বর্তমান সরকার বহন করতে পারবে না। সম্পূর্ণ কর্মসংস্থানমুখী ইনসেন্টিভ এবং স্বচ্ছ নীতির হাত ধরেই বাংলা শিল্পচিত্রে নতুন যুগ দেখবে বলে বার্তা শুভেন্দুর।
পরিকাঠামোগত সুবিধা
মুখ্যমন্ত্রী শিল্পপতিদের উদ্দেশে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার পাশে থাকবে। রাজ্যের শিল্পাঞ্চলগুলিতে জমির ব্যবহার এবং পরিকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর উপরও জোর দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে বলেই আশা সরকারের। আরও শিল্প আসবে। শিল্প সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে শিল্পপতি গৌতম আদানির সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকের প্রসঙ্গ টানেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি জানান, শিল্পপতি গৌতম আদানি এবং আম্বানি গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁদের অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। যদিও সেই আলোচনার সব কথা এখনই প্রকাশ্যে আনতে চাননি তিনি, তবে আদানি গোষ্ঠী যে বাংলার একাধিক সেক্টরে কাজ করতে চলেছে, সে বিষয়ে পূর্ণ আশ্বাস মিলেছে। সেই লক্ষ্যে আগামী ১০ দিনের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বা টিম রাজ্যে পাঠাচ্ছে আদানি গোষ্ঠী। পাশাপাশি শিল্পপতি গৌতম আদানি আজ সকাল ১১ টায় নিউটাউনে প্রায় দু’হাজার শয্যাবিশিষ্ট ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’ বা হাসপাতালের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply