মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারত থেকে জম্মু-কাশ্মীরকে আলাদা করতে চেয়েছিল আসিয়া আন্দ্রাবি। (Asiya Andrabi) সঙ্গে ছিল তার দুই সহকারী সোফি ফাহমিদা এবং নাহিদা নাসরিন। ২০১৮ সালে গ্রেফতার হয়েছিল এরা তিনজন। দীর্ঘ ৭ বছর মামলা চলার পর কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদী নেত্রী আসিয়া আন্দ্রাবিকে (Asiya Andrabi) সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপের মামলায় আজীবন কারাদণ্ড দিল দিল্লির বিশেষ আদালত। একই মামলায় তার সহযোগী সোফি ফাহমিদা (Sofi Fehmeeda) এবং নাহিদা নাসরিনকে (Nahida Nasreen) ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার আদালত এই সাজা ঘোষণা করে। এর আগে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি, তিনজনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা নিষিদ্ধ সংগঠন দুখতারান-এ-মিল্লাত-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপে অংশ নিয়েছিল। এই সংগঠনটি জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারত থেকে পৃথক করার পক্ষে কাজ করত।
কোন কোন ধারায় দোষী
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে দেশবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত ছিল এবং নিষিদ্ধ সংগঠন দুখতারান-এ-মিল্লাত (Dukhtaran-e-Millat)-এর মাধ্যমে কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী মতাদর্শ ছড়াত। তদন্তে উঠে এসেছে, তারা বিভিন্ন বক্তব্য, ভিডিয়ো ও প্রচারের মাধ্যমে ভারতের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে প্রচার চালাত এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপকে পরোক্ষে সমর্থন করত। ২০১৮ সালে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA) আসিয়া-সহ তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করে। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ, উস্কানিমূলক ভাষণ এবং কাশ্মীরকে ভারত থেকে আলাদা করার ষড়যন্ত্রে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার পরে গত ১৪ জানুয়ারি আদালত ইউএপিএ (UAPA)-র একাধিক ধারা এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় তাদের দোষী সাব্যস্ত করে। দেশের মধ্যে অশান্তি তৈরি, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মতো অভিযোগের কারণে এনআইএ আন্দ্রাবির যাবজ্জীবনের আবেদন জানিয়েছিল, তা মেনেই এ দিন সাজা ঘোষণা করে আদালত। আন্দ্রাবি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাবি ছিল, অভিযুক্তরা শুধুমাত্র মতাদর্শগত স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সক্রিয়ভাবে এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার জন্য হুমকি তৈরি করেছিল। আদালতও সেই যুক্তিকে গুরুত্ব দিয়েই এই কঠোর সাজা ঘোষণা করেছে।
দুখতারান-এ-মিল্লাত ও আসিয়া আন্দ্রাবি
দুখতারান-এ-মিল্লাত ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি কাশ্মীরভিত্তিক মহিলা সংগঠন, যার নেতৃত্বে ছিল আসিয়া আন্দ্রাবি (Asiya Andrabi)। ৬২ বছর বয়সি আসিয়া আন্দ্রাবি ‘দুখতারান-এ-মিল্লাত’ (DeM)-এর প্রতিষ্ঠাতা। সংগঠনটি প্রথমে একটি সামাজিক সংস্কারমূলক গোষ্ঠী হিসেবে শুরু হয়। ১৯৯১ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে পর্দা প্রথা বাধ্যতামূলক করার প্রচারাভিযানের মাধ্যমে সংগঠনটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকার এটিকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে নিষিদ্ধ তকমা দেয়। পরে ২০১৮ সালে জাতীয় তদন্ত সংস্থা (NIA) আন্দ্রাবিকে গ্রেফতার করে।
জামাত-এ-ইসলামির সঙ্গে যোগ
১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করা আন্দ্রাবি শ্রীনগরে হোম সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করে এবং সেখান থেকেই স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে। পরবর্তীতে দার্জিলিংয়ে স্নাতকোত্তর করার পরিকল্পনা থাকলেও পরিবারের অনুমতি না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। এর পরে সে ইসলামিক সাহিত্যচর্চার দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা তার মতাদর্শে বড় প্রভাব ফেলে। পরে জামাত-এ-ইসলামির মহিলা শাখায় যোগ দেয় আসিয়া। ১৯৯০ সালে আশিক হুসেন ফাকতুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় আন্দ্রাবি। আশিক বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছে। দুই সন্তানের মা আন্দ্রাবিকে প্রথম ১৯৯৩ সালে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে একাধিকবার পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট (PSA)-এর আওতায় তাকে আটক করা হয়েছে।
জাতীয় ঐক্য রক্ষায় কেন্দ্রের কঠোর অবস্থান
কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের ভূমিকা বহুচর্চিত ও আলোচিত। পাকিস্তান, বিশেষ করে তার গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই যে এই জঙ্গি সংগঠনগুলি মারফত কাশ্মীরে ভারতের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তা-ও সর্বজনবিদিত। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে জঙ্গিদের বিরামহীন সংঘর্ষে হাজার-হাজার প্রাণ যাচ্ছে উভয় পক্ষেই। এই আবহে কেন্দ্রের মোদি সরকার ২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে নেয়। কেন্দ্রীয় সরকার ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করে। এই সিদ্ধান্তের পরে কাশ্মীরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন। বিশেষ করে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের পর কেন্দ্র সরকার যে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়েছে, এই রায় সেই প্রক্রিয়ারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, আন্দ্রাবি-সহ অন্যদের বিরুদ্ধে এই সাজা কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের নীতি ও অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে তুলল। এই মামলাটি কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের বৃহত্তর অভিযানের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আদালতের এই রায় দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় সরকারের কঠোর অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে।

Leave a Reply