মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পূর্ব ভারতে নকশালবিরোধী অভিযানে বড় সাফল্য পেল নিরাপত্তা বাহিনী। তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছিল ২৫ লাখ টাকা। সেই কুখ্যাত মাওবাদী নেতা (Maoist Leader) অজয় মাহতো ওরফে “টাইগার”কে গ্রেফতার করেছে ঝাড়খণ্ডের (Jharkhand) গিরিডির পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ দল। ঝাড়খণ্ডের পাশাপাশি ছত্তিশগড়, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে মোস্ট ওয়ান্টেডের তালিকায় ছিলেন। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, নিষিদ্ধ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন অজয়। গ্রেফতারের সময় তাঁর কাছ থেকে অস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। বর্তমানে তাঁকে মধুবনের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর শিবিরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
মিলতে পারে মাওবাদীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (Jharkhand)
অভিযানের সাফল্য সম্পর্কে রাজ্য পুলিশের অভিযান শাখার কর্তা নরেন্দ্র কুমার সিং বলেন, “এটি রাজ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ অভিযানের বড় সাফল্য।” তাঁর দাবি, অজয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করে মাওবাদী সংগঠনের কাঠামো, অস্ত্র সরবরাহ চক্র, বিস্ফোরক তৈরির নেটওয়ার্ক, তোলাবাজির উৎস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে। নিরাপত্তা আধিকারিকদের মতে, এই তথ্য ঝাড়খণ্ড এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় চলা নকশালবিরোধী অভিযানে গতি আনবে। নরেন্দ্র কুমার সিং বলেন, “আমরা আশা করছি, এই জিজ্ঞাসাবাদ থেকে সক্রিয় সদস্যদের চিহ্নিত করা, সংগঠনের রসদ জোগানের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং ভবিষ্যতের হামলা রুখতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।” অজয় গিরিডি জেলার পিরটাঁড় ব্লকের পান্ডেদিহ গ্রামের বাসিন্দা। তাঁকে নওয়াদিহ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জেলা পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর বিশেষ কোবরা ইউনিট হারলাডি গ্রামের একটি বাড়িতে অভিযান চালায়। সেখানেই তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন। অভিযানের সময় কোনও প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়নি নিরাপত্তা বাহিনীকে।
২০০-রও বেশি ফৌজদারি মামলা
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, অজয় বিহার-ঝাড়খণ্ড বিশেষ এলাকা কমিটির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এই কমিটি ওই অঞ্চলে মাওবাদী সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা। তিনি শুধু সংগঠনের সদস্যই ছিলেন না, বরং বড় বড় হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অন্যতম মূল কুশীলব হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। পুলিশের নথি অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডে তাঁর বিরুদ্ধে ২০০-রও বেশি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। খুন, খুনের চেষ্টা, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা, বিস্ফোরক হামলা, তোলাবাজি, অবৈধ অস্ত্র আইন এবং বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনের একাধিক মামলায়ও রয়েছে তাঁর নাম। তদন্তে উঠে এসেছে সারান্ডা, কোলহান, পশ্চিম সিংভূম-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় মাওবাদী কার্যকলাপ পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। বিস্ফোরক পুঁতে রাখা, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার পরিকল্পনা, সংগঠনের সদস্যদের পরিচালনা এবং কৌশল নির্ধারণে সক্রিয় ছিলেন (Jharkhand) তিনি। গত ছ’বছরে ঝাড়খণ্ডে একাধিক বড়সড় মাওবাদী হামলায় তাঁর যোগসূত্রের প্রমাণও পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। ২০২০ সালে পুলিশকে তথ্য দেওয়ার অভিযোগে এক গ্রামবাসীকে খুন এবং বন দফতরের কার্যালয়ে বিস্ফোরক হামলার ঘটনায় তাঁর নাম উঠে আসে।
একাধিক হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনায়ও যুক্ত
২০২১ এবং ২০২২ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর একাধিক হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনায়ও তাঁর যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে তুম্বাহাকা এবং মেরালগড়া এলাকায় বিস্ফোরক হামলায় কোবরা ব্যাটালিয়নের একাধিক জওয়ান জখম হন। ওই ঘটনাগুলির নেপথ্যেও তাঁর দলের ভূমিকা ছিল বলে দাবি (Maoist Leader) তদন্তকারীদের। ওই বছরে বিস্ফোরক লুট, টোন্টো এলাকায় সংঘর্ষে ঝাড়খণ্ড জাগুয়ার বাহিনীর আধিকারিক অমিত তিওয়ারি এবং কনস্টেবল গৌতম কুমারের মৃত্যুর ঘটনায়ও তাঁর নাম জড়ায়। হাতিবুরু এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনায়ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও অজয়ের দল সক্রিয় ছিল। পুলিশের চর সন্দেহে গ্রামবাসীদের হত্যা, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক বিস্ফোরক হামলা এবং অতর্কিত আক্রমণের একাধিক ঘটনায় তাঁর দলের নাম উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী এবং ঝাড়খণ্ড জাগুয়ার বাহিনীর একাধিক সদস্য নিহত ও জখম হন।
বিস্ফোরক তৈরিতে দক্ষ
২০২৫ সালের অক্টোবরে সমাথা জঙ্গলে বিস্ফোরণে কোবরা ব্যাটালিয়নের একটি প্রশিক্ষিত কুকুর মারা যায়। ২০২৬ সালের মার্চে মারাংপোঙ্গা এবং কিনবির জঙ্গলে সংঘর্ষ ও পরবর্তী বিস্ফোরণে কোবরা ইউনিটের একাধিক আধিকারিক এবং জওয়ান জখম হন। তদন্তকারীদের দাবি, এই হামলাগুলির পরিকল্পনায়ও অজয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। নিরাপত্তা সংস্থাগুলির দাবি, অজয় মাওবাদী সংগঠনের অন্যতম দক্ষ বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ছিলেন (Jharkhand)। বিস্ফোরক তৈরি ও পুঁতে রাখা, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ, তোলাবাজির নেটওয়ার্ক পরিচালনা এবং নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বও তাঁর ওপর ছিল। কৌশলগত পরিকল্পনা এবং বড় হামলার নেপথ্য কারিগর হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। নিরাপত্তা আধিকারিকদের মতে, তাঁর গ্রেফতারের ফলে সারান্ডা, কোলহান এবং গিরিডি অঞ্চলে মাওবাদী সংগঠনের কার্যকলাপে বড় ধাক্কা লাগবে। সংগঠনের নেতৃত্ব, পরিকল্পনা এবং পরিচালন ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অন্য সক্রিয় সদস্যদের গ্রেফতার, অস্ত্র সরবরাহের পথ চিহ্নিত করা এবং আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে অজয়কে
বর্তমানে মধুবনের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর শিবিরে অজয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের আশা, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও একাধিক মাওবাদী সদস্যকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে এবং সক্রিয় নাশকতা চক্রগুলিকেও ভেঙে দেওয়া যাবে। এক শীর্ষ আধিকারিক বলেন, “এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও, অভিযান এখানেই শেষ নয়। এই সাফল্যকে ভিত্তি করে আমরা এলাকায় স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরও জোরদার অভিযান চালিয়ে যাব (Maoist Leader)।” নিরাপত্তা বাহিনীর মতে, অজয়ের গ্রেফতারি শুধুমাত্র এক কুখ্যাত মাওবাদী নেতার গ্রেফতারি নয়, বরং বামপন্থী উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে চলা লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সাফল্য। তদন্ত যত এগোবে, ততই মাওবাদী সংগঠনের বাকি থাকা নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা নিতে (Jharkhand) পারে এই গ্রেফতারি।

Leave a Reply