মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত (Mohan Bhagwat)-এর সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। পশ্চিমবঙ্গে সংগঠনকে মজবুত করতে তিন দিনের রাজ্য সফরে এসেছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। বৃহস্পতিবার থেকে বর্ধমানের উল্লাসের মধ্যবঙ্গ প্রান্ত কার্যালয়ে শুরু হয়েছে সাংগঠনিক ‘একত্রীকরণ’ কর্মসূচি ও সাংগঠনিক বৈঠক। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের বিস্তার কেমন, শাখার সংখ্যা বাড়ছে কি না, মূলত সেটাই বুঝতে চাইছেন ভাগবত।
নানা বিষয়ে আলোচনা ভাগবত-শুভেন্দুর
বৃহস্পতিবার, রাতে বর্ধমানের আরএসএস কার্যালয়ে গিয়ে মোহন ভাগবতের সঙ্গে বৈঠক করেন শুভেন্দু। প্রায় এক ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয় দু’জনের। সূত্রের খবর, রাজ্য সরকারের গত পাঁচ মাসের কাজকর্ম থেকে শুরু করে সাংগঠনিক বিষয়, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সূত্রের খবর, রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর গত পাঁচ মাসে কী কী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করা হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য মোহন ভাগবতের সামনে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে পাশাপাশি, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর আরএসএস-এর প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়। যাঁরা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, তা নিয়েও কথা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। তাঁর সঙ্গে বৈঠক সেরে রাত ৯টার পর বর্ধমান থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন মুখ্যমন্ত্রী।
গীতা পাঠের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ, দুর্গাপুজো থেকে সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ
শুধু সাংগঠনিক বিষয় নয়, রাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। কলকাতার পাশাপাশি জেলার দুর্গাপুজোগুলিকেও আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে। এছাড়া, রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নয়নের দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে বলে সূত্রের খবর। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগের প্রসঙ্গেও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আগামী ২৯ ডিসেম্বর কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে গীতা পাঠের কর্মসূচি রয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য মোহন ভাগবতকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
সেবামূলক কর্মসূচির উপর জোর
এদিন সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গেও মত বিনিময় করেন ভাগবত। সূত্রের দাবি, রাজ্যে সেবামূলক কর্মসূচির সংখ্যা আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন মোহন ভাগবত। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে সমাজসেবামূলক কাজের উপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার উল্লাসের প্রান্ত কার্যালয়ে কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার পরে বিকেলে বর্ধমান মডেল স্কুলেও একটি সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশ নেন ভাগবত। সেখানে আরএসএসের মুখ্য শিক্ষক ও কার্যবাহীদের নিয়ে কিছু সময় শরীরচর্চা করেন এবং তাঁদের সঙ্গে সঙ্ঘের বিস্তার নিয়ে আলোচনা করেন। এখানে মূলত একত্রীকরণ কর্মসূচি’ ছিল সঙ্ঘ প্রধানের।
১০২তম প্রতিষ্ঠা দিবসের আগেই রাজ্যে ভাগবত
আরএসএস সূত্রে খবর, বৈঠকে সংঘের প্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ভাগবত। আরও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে বলেছেন। ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীতে সংঘের প্রতিষ্ঠা। ২০২৫ সাল জুড়ে গোটা দেশে ‘শতাব্দী বর্ষ’ পালন করছিল সংঘ। তার অঙ্গ হিসেবে সামাজিক কর্মসূচি এবং জনসংযোগ বৃদ্ধিতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। সে সব কর্মসূচির বেশ কয়েকটি ২০২৬ সালেও চলছিল। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তেও সংঘের নানা জনসংযোগ কর্মসূচি হয়েছিল গত এক বছরে। তাতে লাভ কতটা হল, তৃণমূল স্তরে সংগঠনের কী অবস্থা, রাজ্যে সংঘের শাখা কতটা বিস্তার পেল, তার হিসাবও নিয়েছেন ভাগবত। সংঘের ১০২তম প্রতিষ্ঠা দিবসের সপ্তাহ দুয়েক আগেই তিনি রাজ্যে এসেছেন। শুক্রবার বর্ধমানের সংঘ কার্যালয়েই থাকবেন। সেখানে একাধিক সাংগঠনিক বৈঠক হওয়ার কথা।
শাখার সংখ্যা ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার
জানা গিয়েছে, আজ শুক্রবারও একাধিক কর্মসূচি রয়েছে মোহন ভাগবতের। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেন বিজেপি নেতা ও রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। থাকতে পারেন বিজেপি নেতা অমিতাভ চক্রবর্তীও। তাঁদের সঙ্গে সংগঠন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে খবর। রাজ্যে আরএসএসের শাখার সংখ্যা ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল। ১০ অক্টোবরের মধ্যে তা করার কথা। সেই কাজ কতটা হয়েছে, সেই সব বিষয়ে বর্ধমানে সঙ্ঘের বৈঠকে আলোচনা হবে বলে জানা গিয়েছে। সঙ্ঘের আগামী দিনের সাংগঠনিক পরিকল্পনা, সমাজের বিভিন্ন স্তরে জনসংযোগ বৃদ্ধি এবং শতবর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে চলা কর্মসূচির অগ্রগতি— ভাগবতের সফরে মূলত এই বিষয়গুলিই গুরুত্ব পাচ্ছে।
সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কাজের হিসেব পেশ
এ রাজ্যে আরএসএস-এর তিনটি সাংগঠনিক প্রান্তই দশ দিনের বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল শাখার সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে। মধ্যবঙ্গে শুরু হয়েছিল ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে শুরু হয়েছিল ১ অক্টোবর থেকে। ১০ অক্টোবর মহালয়া। তার পর দিন থেকে দেবীপক্ষ শুরু, উৎসবের ঢাকে কাঠি। তাই মহালয়ার মধ্যেই শাখার বৃদ্ধির অভিযান শেষ করা হচ্ছে। অভিযান শেষ হওয়ার দু’দিন আগেই ভাগবত বর্ধমানে বৈঠক বসছেন। ফলে শাখা বৃদ্ধির চূড়ান্ত হিসাব তাঁর সামনে পেশ করা সম্ভব হবে না। তবে শাখা বৃদ্ধি অভিযানের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কাজের হিসেব হাতে নিয়েই পশ্চিমবঙ্গের আরএসএস পদাধিকারীরা সরসঙ্ঘচালকের মুখোমুখি হয়েছেন। দক্ষিণবঙ্গ আরএসএস-এর প্রচার প্রমুখ বিপ্লব রায় জানিয়েছেন, শতাব্দী বর্ষে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ‘প্রবুদ্ধ নাগরিক সম্পর্ক’ অভিযান করেছে সংঘ। কোথাও বিশিষ্ট নাগরিকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখা করা হয়েছে। কোথাও তাঁদের অনেককে একসঙ্গে কোনও কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে। বিভিন্ন মঠ ও মিশন বছরভর রাজ্যের নানা প্রান্তে ‘হিন্দু সম্মেলন’ আয়োজন করেছে। সবশেষে রাজ্য জুড়ে ৮০০-রও বেশি জায়গায় হয়েছে ‘যুব সম্মেলন’। বিপ্লবের কথায়, ‘‘এত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হল, সঙ্ঘ সম্পর্কে তাঁদের উৎসাহ বাড়ল। সে উৎসাহকে এ বার কাজে লাগানোর সময় এসেছে। যাঁদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে, তাঁদের শাখায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অনেক জায়গায় সঙ্ঘের সংস্পর্শে আসা মানুষজন নিজেরাই শাখা শুরু করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।’’ আগামিকাল, শনিবার সকালে বর্ধমানে শেষ দফার কর্মসূচি সেরে কলকাতা বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেবেন মোহন ভাগবত।

Leave a Reply