মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারত এখন শুধু একটি বড় বাজার নয়, বরং বিশ্বের প্রবৃদ্ধির অন্যতম ‘লঞ্চপ্যাড’। নিউজিল্যান্ড সফরে সে দেশের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী মহলের সামনে এমনই বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (PM Modi in New Zealand)। একই সঙ্গে ভারত-নিউজিল্যান্ডের সদ্য স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, পরিষেবা এবং দক্ষ জনশক্তির ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে বলেও মন্তব্য করেন মোদি। দুই দিনের নিউজিল্যান্ড সফরের অংশ হিসেবে ইন্ডিয়া-নিউজিল্যান্ড বিজনেস অ্যান্ড স্পোর্টস এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাত্র নয় মাসের রেকর্ড সময়ে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর মতে, এই চুক্তির ফলে আগামী দিনে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে। এর ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, বলেও বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর।
ভারতের উন্নয়ন-যাত্রার অংশীদার
প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী ১৫ বছরে নিউজিল্যান্ড ভারতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। তিনি বলেন, “এটি শুধু বিনিয়োগ নয়, ভারতের উন্নয়নের যাত্রার অংশীদার হওয়ার অঙ্গীকার। ভারতের অর্থনৈতিক শক্তির কথা তুলে ধরে মোদি বলেন, “বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে ভারতের ভিত্তি এখন আরও শক্তিশালী হয়েছে। দ্রুত বাড়তে থাকা মধ্যবিত্ত, ডিজিটাল রূপান্তর এবং ব্যাপক পরিকাঠামো উন্নয়নের ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারত অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। সংস্কার, কর্মদক্ষতা এবং রূপান্তর— এই তিন স্তম্ভের উপরই আমাদের শাসনব্যবস্থা দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভারতে রয়েছে নীতিগত স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি। তাই বিশ্বের উদ্দেশে আমাদের বার্তা স্পষ্ট— ভারত শুধু একটি বাজার নয়, বিশ্ব প্রবৃদ্ধির লঞ্চপ্যাড।”
ভারতে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ
দেশে বিনিয়োগের নতুন সুযোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি জানান, স্মার্ট সিটিজ মিশনের অধীনে দেশের ১০০টি শহরে ৮,০০০-রও বেশি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। নগর পরিবহণ, জল ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের সংস্থাগুলিকে অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেও ভারতে ক্যাম্পাস স্থাপনের আমন্ত্রণ জানান। নিউজিল্যান্ডের মাওরি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের উদ্দেশেও বিশেষ বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভারতের প্রাচীন সভ্যতার মূল্যবোধ এবং মাওরি সংস্কৃতির মধ্যে প্রকৃতি, সমাজ ও টেকসই উন্নয়নের প্রতি একই ধরনের শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে মাওরি ব্যবসায়ীদের জন্যও বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইন্ডিয়া-নিউজিল্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ
পরে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন আয়োজিত এক নৈশভোজে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোদি বলেন, গত বছর লাক্সনের ভারত সফরের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক নতুন গতি পেয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, চার দশক পর কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিউজিল্যান্ড সফর করছেন। মোদির কথায়, “আমার পূর্বসূরিরা অনেক ভালো কাজ অসম্পূর্ণ রেখে গিয়েছিলেন। সেই কাজগুলিই আমি সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করছি।” এদিন দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এ উন্নীত করে এবং ‘ইন্ডিয়া-নিউজিল্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ: রোডম্যাপ টু ২০৩০’ গ্রহণ করে। এই রোডম্যাপে বাণিজ্য, কৃষি, প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, উদ্ভাবন, শিক্ষা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের পণ্য ও পরিষেবা বাণিজ্য ৭ বিলিয়ন নিউজিল্যান্ড ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সদ্য স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার ব্যাপারেও উভয় দেশ সম্মত হয়েছে।
লাক্সন-মোদি শীর্ষ বৈঠকে ১০টি সমঝোতা স্মারক
লাক্সন-মোদি শীর্ষ বৈঠকে ১০টি সমঝোতা স্মারক (MoU) সাক্ষর হয়েছে। প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পর্যটন, কৃষি, ক্রীড়া, শিক্ষা ও সংস্কৃতি-সহ একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য চুক্তিগুলির মধ্যে রয়েছে ভারতীয় নৌবাহিনী ও নিউজিল্যান্ড ডিফেন্স ফোর্সের মধ্যে পারস্পরিক লজিস্টিকস সহায়তা, সামুদ্রিক সহযোগিতা, হাইড্রোগ্রাফি এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন। এছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলা, পশুপালন ও দুগ্ধ শিল্প, পর্যটন, ক্রীড়া, সামুদ্রিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্পর্কেও একাধিক সমঝোতা হয়েছে। এছাড়াও মেরিটাইম সিকিউরিটি ডায়ালগ চালু করা, ইন্দো-প্যাসিফিক ওশানস ইনিশিয়েটিভ (IPOI)-এর সামুদ্রিক নিরাপত্তা অংশে নিউজিল্যান্ডের যোগদান, গ্লোবাল বায়োফুয়েলস অ্যালায়েন্সে সদস্যপদ গ্রহণ, নাগাল্যান্ড ও উত্তরাখণ্ডে কিউইফ্রুট সেন্টার অফ এক্সেলেন্স স্থাপন, অ্যান্টার্কটিকা গবেষণা এবং খাদ্য প্রযুক্তি শিক্ষায় সহযোগিতা বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাও করা হয়েছে।

Leave a Reply