মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: সাত বছর পরে আবার চিন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (PM Modi Visit China)। সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) সম্মেলনের ফাঁকে ৩১ অগাস্ট চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। ড্রাগনভূমির বন্দর শহর তিয়ানজিনে ওই বৈঠক হবে। সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী মোদিকে মেগা অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বেজিং। মার্কিন শুল্কযুদ্ধের আবহে একে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সফর কেন তাৎপর্যপূর্ণ
২০১৭ সালের ডোকলাম এবং ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চিন সম্পর্ক (India-China Relation) কার্যত থেমে গিয়েছিল। সীমান্ত থেকে সেনা সরানো নিয়ে বহু দফার আলোচনা হলেও সেভাবে অগ্রগতি হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে, মোদির তিয়ানজিন সফর এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO)-এর সম্মেলনে যোগদান কূটনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মোদির সম্ভাব্য বৈঠকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতির পটভূমিতে মোদি-জিনপিং বৈঠক
এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আন্তর্জাতিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভারতের রফতানির উপর ৫০% ট্যারিফ বসিয়েছে, যার ফলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এছাড়াও, রাশিয়ার কাছ থেকে ছাড়মূল্যে তেল কেনা নিয়ে ওয়াশিংটনের অসন্তোষ ভারতকে চাপে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে, চিনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে ভারত কৌশলগতভাবে বিকল্প পথ তৈরি করতে চায়। ভারত ও চিন প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, এ বারের এসসিও বৈঠকে ‘রুশ ভারত চিন ত্রিশক্তি’ বা রিচ ট্রয়িকার (রাশিয়া-ইন্ডিয়া-চায়না ট্রয়িকা) পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সীমান্ত সমস্যা মোকাবিলা
প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রেসিডেন্ট জিনপিং-এর (PM Modi Visit China) মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠককে কেন্দ্র করেও পারদ চড়তে শুরু করেছে। সীমান্ত সংঘাত মেটাতে দু’তরফে একাধিক সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে সৈন্য প্রত্যাহার, বাণিজ্য এবং ভিসা নীতিকে শিথিল করার ব্যাপারে বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন মোদি ও জিনপিং। কূটনৈতিক মহলের অভিমত, যে ভাবে মার্কিন শুল্কনীতির বিরুদ্ধে মোদি রুখে দাঁড়িয়েছেন, তাতে সীমান্ত সংঘাত মেটাতে দর কষাকষির ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছেন তিনি। কারণ, ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী মোদির ভূয়সী প্রশংসা করেছে জার্মানি ও ফ্রান্স। শুধু তা-ই নয়, এই বছরই ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি করতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ)। এই পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিকে দলে টানতে হলে সীমান্তে সমঝোতা করা ছাড়া বেজিঙের কাছে দ্বিতীয় রাস্তা খোলা নেই।
ভারতের সুবিধা
আন্তর্জাতিক মহলের মতে, এসসিওর অনেক কিছুই অস্পষ্ট। কিছু ক্ষেত্রে চিনের অর্থনীতি বেশি পরিমাণে আমেরিকার উপরে নির্ভরশীল। ভারতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে শীতলতা এলেও ইউরোপের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। ফ্রান্স, জার্মানি বা ইটালির বাজার পাওয়া বেজিঙের পক্ষে কঠিন। সব মিলিয়ে সমঝোতায় অনেক কিছুই আদায় করার সুযোগ পাবেন প্রধানমন্ত্রী মোদি (PM Modi Visit China)। গত বছর রাশিয়ার কাজানে ‘ব্রিকস’ সম্মেলনে পুতিন ও জিনপিঙের সঙ্গে এক মঞ্চে ছিলেন মোদি। ওই সময় থেকে চিনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও করেন তিনি। প্রায় ১০ মাস পর ফের সেই ছবি প্রত্যক্ষ করবে বিশ্ব।
মোদি-শি বৈঠকে সম্পর্কে নতুন মোড়
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সীমান্ত সমস্যা রাতারাতি মিটে যাবে এমন আশা করা যায় না। তবে দীর্ঘ সময় পর দুই শীর্ষনেতার মুখোমুখি বৈঠক অন্তত নতুন করে আস্থা গড়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। সীমান্তে নতুন চিন্তা অথবা সংঘর্ষ প্রতিরোধে যৌথ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতের সম্পর্কের ভিত শক্ত করতে পারে। ভারত-চিন সম্পর্কের (India-China Relation) উষ্ণতা এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। দক্ষিণ চিন সাগরের উত্তেজনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মার্কিন-চিন দ্বন্দ্বের মধ্যে যদি দিল্লি ও বেজিং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, তবে তা গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হবে। পাশাপাশি এসসিও (SCO) ও ব্রিকস (BRICS)-এর মতো সংগঠনগুলিকেও এই সম্পর্ক নতুন প্রাসঙ্গিকতা দিতে পারে।
Leave a Reply