US House Honour Indian Pilot: ফ্লাইদুবাই বিমানে হামলা ঠেকানো ভারতীয় পাইলটকে সম্মান জানাতে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব

us house honour indian pilot captain smit machchhar for foiling flydubai hijacking

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পিছন থেকে আসছিল একের পর এক আঘাত। প্রথমে ভেবেছিলেন, বিমানের বড় কোনও ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু পর পর আঘাত আসতেই বুঝতে পারেন, বিমানে কিছু হয়নি। ককপিটে তাঁর সঙ্গে যিনি আছেন, তিনি কিছু করছেন। এর পর সহকারী পাইলটকে আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন ফ্লাইদুবায়ের ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছার। কিন্তু মাথায় আঘাতের কারণে তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। ফলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মনে মনে আওড়াচ্ছিলেন হনুমান চল্লিশা। হঠাতই সঞ্জীবনী মন্ত্রে তাঁর মাথায় কাজ করে উপস্থিত বুদ্ধি। কোনওরকমে খুলে দেন ককপিটের দরজা। বেঁচে যায় ১৭৪ জন বিমানযাত্রীর জীবন। ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা ঠেকিয়ে যাত্রীদের জীবন রক্ষায় অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন স্মিত। এবার, ভারতীয় পাইলটকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানাতে উদ্যোগী হল মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস।

মার্কিন কংগ্রেসে সাহসিকতার পুরস্কার

স্মিতের সাহসিকতার পাশাপাশি ফ্লাইটের ক্রু ও যাত্রীদের ভূমিকাকেও স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব আনা হয়েছে মার্কিন কংগ্রেসে। গত ৫ অক্টোবর কংগ্রেসম্যান জোশ গটহাইমার এইচ রেস ১৬১২ নামে প্রস্তাবটি হাউসে উত্থাপন করেন। এতে মাইকেল ম্যাককল এবং ডন বেকন সহ-প্রস্তাবক হিসেবে রয়েছেন। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত প্রস্তাবটি হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও তা পূর্ণাঙ্গ হাউসে পাস হয়নি। প্রস্তাবটির শিরোনাম— ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছার এবং ফ্লাইদুবাই ফ্লাইট ১০৭৩-এর ক্রু ও যাত্রীদের সম্মান জানানো এবং বিমানটিতে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার প্রচেষ্টার নিন্দা জানানো (Honouring Captain Smit Machchhar and the crew and passengers of Flydubai Flight 1073)।

মাঝ আকাশে ককপিটে সন্ত্রাসী হামলা

৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আভিভের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশে উড়ে যায় ফ্লাইদুবাই ফ্লাইট ১০৭৩। বিমানে ছিলেন প্রায় ১৭৪ জন যাত্রী, যাঁদের মধ্যে ২৭ জন শিশু এবং চারজন মার্কিন নাগরিক ছিলেন। উড়ানের মাঝপথে বিমানের ফার্স্ট অফিসার বা সহকারী পাইলট ককপিটে ক্যাপ্টেন মচ্ছারের ওপর জরুরি ব্যবহারের কুঠার দিয়ে হামলা করেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর মাত্র ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে বিমানটি ১৪ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতা হারায়। পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয় এবং বিমানটি একটি বড় ধরনের দুর্ঘটনার মুখে পড়েছিল বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন মচ্ছার প্রতিরোধ চালিয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। তাঁর এই পদক্ষেপই পরিস্থিতি বদলে দেয়। বিমানে থাকা অফ-ডিউটি পাইলটরা ককপিটে ঢুকতে পারেন এবং কেবিন ক্রু ও যাত্রীরা মিলে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। নিরাপদে অবতরণ করে বিমানটি। বিমানে থাকা সমস্ত যাত্রী ও ক্রু নিরাপদে মাটিতে নামতে সক্ষম হন।

‘অসাধারণ সাহসিকতার’ প্রশংসা

মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত প্রস্তাবে ক্যাপ্টেন মচ্ছারের সাহসিকতার বিশেষভাবে প্রশংসা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নিজের জীবন বিপন্ন করে তিনি বিমানে থাকা প্রত্যেক মানুষের জীবন রক্ষায় “অসাধারণ সাহসিকতা” দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে অফ-ডিউটি পাইলট, কেবিন ক্রু এবং যাত্রীদেরও প্রশংসা করা হয়েছে। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই ককপিট সুরক্ষিত করা এবং বিমানটিকে নিরাপদে অবতরণ করানো সম্ভব হয়েছিল।

‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে চিহ্নিত

ঘটনার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে মার্কিন প্রস্তাবে। ৩ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, তদন্তে প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে যে ফার্স্ট অফিসার বিমানটিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ক্যাপ্টেন মচ্ছারকে কুঠার দিয়ে আক্রমণ করে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও জানানো হয়। তবে হামলার উদ্দেশ্য, ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি এবং এর সঙ্গে অন্য কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মার্কিন হাউসের প্রস্তাবে ঘটনাটিকে “সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড” হিসেবে নিন্দা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তার ওপর এই হামলাকে গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও দ্রুত তদন্তের দাবি

ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও দ্রুত তদন্তের জন্য সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের এই প্রস্তাব। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

গুরুতর আহত অবস্থাতেও হাল ছাড়েননি

ঘটনার পর ক্যাপ্টেন মচ্ছারের সাহসিকতার আরও কিছু বিবরণ সামনে আসে। গুরুতর আহত অবস্থাতেও তিনি বুঝতে পারেন, ককপিটের দরজা খুলতে পারলে অন্যরা সেখানে ঢুকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজেকে সামলে দরজার কাছে পৌঁছন এবং সেটি খুলতে সক্ষম হন। তাঁর এই সিদ্ধান্তই অন্যদের হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত বিমানটি ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়। হাসপাতালের শয্যা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলার সময় মচ্ছার সেই মুহূর্তের কথা জানান। আহত অবস্থাতেও কীভাবে নিজেকে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে পৌঁছনোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা তিনি তুলে ধরেন। ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, ক্যাপ্টেন মচ্ছার সুস্থ হয়ে উঠছেন। তাঁর সাহসিকতার জন্য ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের বিভিন্ন মহল থেকেও প্রশংসা এসেছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে ভারতীয় পাইলট

ফ্লাইট ১০৭৩-এর ঘটনা শুধু একজন পাইলটের ব্যক্তিগত সাহসিকতার গল্প নয়। এটি আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে। একজন ভারতীয় ক্যাপ্টেন, অফ-ডিউটি পাইলট, কেবিন ক্রু এবং সাধারণ যাত্রীরা একসঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করে সম্ভাব্য বড় ধরনের প্রাণহানি রুখে দেন। মার্কিন কংগ্রেসের প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত হাউসে পাস হলে ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছারের সাহসিকতা আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন কংগ্রেসের স্বীকৃতি পাবে। তবে সেই স্বীকৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত—গুরুতর আহত অবস্থাতেও ক্যাপ্টেন মচ্ছার হাল ছাড়েননি। তিনি ককপিটের দরজা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। আর সেই কয়েক মুহূর্তের সাহসই ১৭৪ জন যাত্রীর জীবন বাঁচানোর পথ খুলে দিয়েছিল।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share