মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: জার্মানির সঙ্গে মউ স্বাক্ষর করে দেশের নৌবাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা-শিল্প চুক্তি চূড়ান্ত করার দিকে এগোচ্ছে ভারত। জার্মান সাবমেরিন নির্মাতা থিসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (TKMS)-এর সঙ্গে মুম্বইয়ের মাজগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড (MDL)-এর অংশীদারিত্বে ভারতীয় নৌসেনার জন্য ছয়টি অত্যাধুনিক প্রচলিত (ডিজেল-চালিত) সাবমেরিন নির্মাণের পথে এগোচ্ছে এই চুক্তি। এই মুহূর্তে ভারত সফরে এসেছেন জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। সোমবার তিনি গুজরাটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সারেন। এর পরই, দুই রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতিতে একাধিক বিষয়ে মউ স্বাক্ষিরত করে তা বিনিময় উভয় পক্ষের শীর্ষ আধিকারিকরা।
যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে, ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য ছয়টি প্রচলিত (কনভেনশনাল) সাবমেরিন কেনার বিষয়ে জার্মানির সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক দিকেই এগোচ্ছে। তবে, চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। শীর্ষ কেন্দ্রীয় সূত্রের মতে, বর্তমানে চুক্তির প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন দিক নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা চলছে এবং একটি গঠনমূলক সমাধান নিয়ে আশাবাদ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে, বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রি বলেন, “এই ধরনের চুক্তিতে প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও বাণিজ্যিক আলোচনা থাকে। এসব আলোচনা ইতিবাচক গতিতে এগোচ্ছে। চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে আলোচনা ইতিবাচকভাবেই চলছে এবং আমরা একটি ইতিবাচক ফলাফলের আশা করছি।”
৭২০০০০০০০০০০ টাকার চুক্তি!
কেন্দ্রীয় সূত্রের মতে, জার্মানির সঙ্গে এই সাবমেরিন নির্মাণের চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭২,০০০ কোটি টাকা) মূল্যের এই চুক্তির মাধ্যমে বহু প্রতিক্ষিত ‘প্রজেক্ট–৭৫আই’ টেন্ডারের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে. চা হবে দেশের সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে সর্ববৃহৎ অঙ্কের চুক্তি। নীতিগত পরিবর্তন, কঠোর প্রযুক্তিগত শর্ত এবং পরীক্ষিত ও টিকে থাকার ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন প্রযুক্তির ওপর ভারতের জোরের কারণেই এই প্রকল্প দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল।
এই চুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে ভারতীয় নৌবাহিনীর জার্মান ‘টাইপ–২১৪ নেক্সট জেনারেশন’ (Type-214NG) সাবমেরিন নির্বাচন। প্রায় ২,৫০০ টন ওজনের এই ডিজেল–ইলেকট্রিক সাবমেরিনে রয়েছে এয়ার–ইনডিপেন্ডেন্ট প্রোপালশন বা এআইপি (AIP) ব্যবস্থা। স্পেনের নাভান্তিয়া প্রস্তাবিত এস–৮০ প্লাস সাবমেরিনকে পিছনে ফেলে টাইপ–২১৪এনজি বেছে নেওয়া হয়েছে মূলত এই সাবমেরিনের পরীক্ষিত এআইপি প্রযুক্তি, উন্নত শব্দ-নীরবতা (অ্যাকোস্টিক স্টেলথ) এবং কম জীবনচক্র ঝুঁকির কারণে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সমুদ্র অঞ্চলে দীর্ঘ সময় গোপনে কাজ করাই যেখানে প্রধান লক্ষ্য, সেখানে জার্মান প্ল্যাটফর্মের পরিণত ও পরীক্ষিত প্রযুক্তিই সিদ্ধান্তে নির্ণায়ক হয়েছে।
কেন এআইপি ও স্টেলথ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ?
আধুনিক প্রচলিত সাবমেরিনের ক্ষেত্রে এআইপি এখন প্রায় অপরিহার্য। সাধারণ ডিজেল–ইলেকট্রিক সাবমেরিনকে ব্যাটারি চার্জের জন্য মাঝেমধ্যে ভেসে উঠতে বা স্নরকেল ব্যবহার করতে হয়, যা শত্রুপক্ষের নজরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়। এআইপি-যুক্ত সাবমেরিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ জলের নিচে থাকতে পারে, অত্যন্ত কম শব্দ ও ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সিগনেচার বজায় রেখে টহল, নজরদারি ও আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করে।
টাইপ–২১৪এনজি সাবমেরিনে ব্যবহৃত ফুয়েল–সেল নির্ভর এআইপি ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও কার্যত পরীক্ষিত প্রযুক্তি হিসেবে পরিচিত। বিপরীতে, স্পেনের বায়ো-ইথানল ভিত্তিক এআইপি প্রযুক্তি এখনও সমপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেনি। জলতলের যুদ্ধে যেখানে ব্যর্থতার কোনও সুযোগ নেই, সেখানে পরীক্ষিত প্রযুক্তিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে ভারতীয় নৌবাহিনী।
১৯৭১: করাচি আক্রমণ ও নৌশক্তির পাঠ
স্টেলথ ও সহনশীলতার ওপর ভারতের জোরের পেছনে রয়েছে কঠোর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। ১৯৭১ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধে অপারেশন ট্রাইডেন্ট ও অপারেশন পাইথনের মাধ্যমে ভারতীয় নৌবাহিনী পাকিস্তানের প্রধান সমুদ্রবন্দর করাচিতে বিধ্বংসী হামলা চালায়। এই আঘাতে পাকিস্তানের নৌ লজিস্টিক্স ও জ্বালানি পরিকাঠামো কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের সমুদ্রভিত্তিক অভিযান দীর্ঘমেয়াদে অচল হয়ে যায়।
এই হামলা ছিল কেবল কৌশলগত নয়, গভীরভাবে কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন। এটি যুদ্ধের পরিণতি ত্বরান্বিত করে এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। প্রথমবারের মতো ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে যে, সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ স্থলযুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। তবুও পরবর্তী দশকগুলিতে ভারতের সাবমেরিন আধুনিকীকরণ ধীরগতিতে এগোয়। বিলম্বিত কেনাকাটা, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং নীতিগত জড়তার ফলে নৌবাহিনীর জলতল বহর পুরনো হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে প্রজেক্ট–৭৫আই কেবল একটি সামরিক ক্রয় নয়, ১৯৭১-এর শিক্ষা থেকে উদ্ভূত বহু প্রতীক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ।
অপারেশন ‘সিঁদুর’ ও করাচির পুনরাবির্ভাব
গত বছরের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে সামনে আসে। বড়সড় সন্ত্রাসী উসকানির পর ভারত–পাকিস্তান উত্তেজনা বাড়লে ৮ থেকে ১১ মে পর্যন্ত ভারতীয় নৌবাহিনী ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুতি’তে ছিল। বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের দাবি, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে পাকিস্তানের আর্থিক ও লজিস্টিক প্রাণকেন্দ্র করাচি বন্দরে আঘাত হানার জন্য ভারত প্রস্তুত ছিল।
আজও করাচি পাকিস্তানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড—দেশটির অধিকাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি আমদানি ও আর্থিক প্রবাহ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। ১৯৭১-এর পুনরাবৃত্তির বিশ্বাসযোগ্য হুমকি—এবার আরও উন্নত নজরদারি, ক্ষেপণাস্ত্র ও জলতল সক্ষমতা নিয়ে— প্রমাণ করে যে, নৌ শক্তি শট না ছুড়েও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অপারেশন ‘সিঁদুর’ আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সমুদ্রে, আর তা কাজে লাগাতে ভারতের দরকার শক্তিশালী জলতল আধিপত্য।
এই প্রেক্ষাপটে ভারত–জার্মানি সাবমেরিন চুক্তির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি নিছক শান্তিকালীন আধুনিকীকরণ নয়, বরং সাম্প্রতিক বাস্তব সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা সক্ষমতা বৃদ্ধি। নতুন প্রজন্মের সাবমেরিন যুক্ত হলে করাচির ওপর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ভারতীয় নৌবাহিনীর ক্ষমতা আরও বাড়বে, যা নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও স্থায়ী জলতল আঘাতের মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করবে।
প্রজেক্ট—৭৫আই-এ ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’
এই চুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—ছয়টি সাবমেরিনই ভারতে নির্মিত হবে। প্রধান নির্মাণ সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পাবে এমডিএল। টিকেএমএস নকশা কর্তৃত্ব, প্রকৌশল সহায়তা, পরামর্শ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। এর ফলে ভারত কেবল সাবমেরিন প্ল্যাটফর্মই নয়, গভীর প্রযুক্তিগত দক্ষতাও অর্জন করবে—যা ভবিষ্যতের নৌ শক্তি গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply