মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আঠারো বছরের অপেক্ষা, অসংখ্য ব্যর্থতা, হৃদয়ভাঙা মুহূর্ত আর ট্রোলের পাহাড় পেরিয়ে ২০২৫ সালে প্রথমবার আইপিএল ট্রফি জিতেছিল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (RCB)। আর সেই সাফল্য যে কেবল একবারের বিস্ময় ছিল না, তা প্রমাণ করে দিল তারা ২০২৬ সালেও। টানা দ্বিতীয়বার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম অভিজাত ক্লাবে নাম লিখিয়ে ফেলল বিরাট কোহলি-রজত পাটিদারদের দল। এর আগে কেবল মুম্বই ইন্ডিয়ান্স এবং চেন্নাই সুপার কিংসই আইপিএলে টানা দু’বার শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছিল। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল আরসিবির নাম। শুধু শিরোপা জয় নয়, গোটা মরশুমে আধিপত্য বিস্তার করে প্রতিপক্ষদের কার্যত গুঁড়িয়ে দিয়েছে বেঙ্গালুরু।
শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে আরসিবি
লিগ পর্বে ১৮ পয়েন্ট সংগ্রহ করে শীর্ষস্থানে শেষ করেছিল আরসিবি। এরপর কোয়ালিফায়ার ১-এ গুজরাট টাইটান্সকে ৯২ রানে বিধ্বস্ত করে সরাসরি ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে তারা। ফাইনালেও সেই একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একতরফা জয় তুলে নেয় বেঙ্গালুরু। ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য অবসর নিয়েছেন, দলে এসেছে একাধিক পরিবর্তন। কিন্তু মাঠে তার কোনও প্রভাবই দেখা যায়নি। যেন গত বছরের সফল অভিযানের ধারাবাহিকতাই বজায় রেখেছে তারা।
আহমেদাবাদে গুজরাতের মাঠেও ছিল আরসিবির রাজত্ব
নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম ছিল গুজরাট টাইটান্সের ‘হোম গ্রাউন্ড’। কিন্তু বাস্তবে ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ম্যাচের আগের দিন থেকেই হাজার হাজার আরসিবি সমর্থক লাল জার্সি পরে আহমেদাবাদে ভিড় জমাতে শুরু করেন। ফাইনালের দিন প্রায় এক লক্ষ দর্শকের মধ্যে সিংহভাগই ছিল আরসিবির সমর্থক। স্টেডিয়ামের প্রতিটি কোণে ধ্বনিত হচ্ছিল “আরসিবি, আরসিবি” স্লোগান। কার্যত নিজেদের ঘরের মাঠেই খেলছিল রজত পাটিদারের দল। আরসিবি ফাইনালের কয়েকদিন আগেই আহমেদাবাদে পৌঁছে প্রস্তুতি শুরু করেছিল। তীব্র গরমে অনুশীলন, উইকেট পর্যবেক্ষণ এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কাজ তারা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে।
বল হাতে গুজরাটকে শ্বাসরুদ্ধ করল বেঙ্গালুরু
টস জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় আরসিবি। রোদে পুড়ে শক্ত হয়ে যাওয়া উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য সহজ ছিল না। সেই সুযোগই পুরোপুরি কাজে লাগান বেঙ্গালুরুর বোলাররা। মরশুমে ৭০০-র বেশি রান করা গুজরাটের দুই ওপেনারকে পাওয়ারপ্লের মধ্যেই ফেরত পাঠিয়ে দেয় তারা। চলতি মরশুমে তৃতীয়বারের মতো শুভমান গিল ও সাই সুদর্শনকে দ্রুত আউট করতে সক্ষম হয় আরসিবি। জশ হ্যাজেলউড বড় ম্যাচে নিজের অভিজ্ঞতার পরিচয় দেন। ভুবনেশ্বর কুমার নিখুঁত পরিকল্পনায় সাই সুদর্শনকে বাউন্সারে ফাঁদে ফেলেন। অন্যদিকে রাসিখ সালাম দার, যাঁকে অনেকেই গুরুত্ব দেননি, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। মাত্র ৩.৪ ওভারে ২৬ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় গুজরাট। এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি তারা। জস বাটলারও পাল্টা আক্রমণের সাহস দেখাতে পারেননি। ওয়াশিংটন সুন্দর একবার জীবনদান পেলেও বড় ইনিংস খেলতে ব্যর্থ হন। শেষদিকে অরশাদ খানের ছোট্ট ঝোড়ো ইনিংস কিছুটা লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিলেও গুজরাট নির্ধারিত ২০ ওভারে ১৫৫ রানেই থেমে যায়।
রান তাড়ায় কোহলির রাজকীয় ইনিংস
১৫৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে দেখা যায় আরসিবিকে। ফিল সল্টের অনুপস্থিতিতে ওপেন করতে নামা ভেঙ্কটেশ আইয়ার এবং বিরাট কোহলি পাওয়ারপ্লেতেই ম্যাচকে একতরফা করে দেন। মাত্র পাঁচ ওভারের মধ্যেই দলীয় স্কোর ৬০ পেরিয়ে যায়। পাওয়ারপ্লে শেষে স্কোরবোর্ডে ৭০ রান। ভেঙ্কটেশ আইয়ার দ্রুত আউট হলেও কোহলি থামেননি। কাগিসো রাবাদার এক ওভারে তিনটি চার ও একটি ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেন তিনি। রশিদ খান নবম ওভারে রজত পাটিদার এবং ক্রুনাল পাণ্ডিয়াকে ফিরিয়ে সামান্য উত্তেজনা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সেটুকুই। কোহলির সঙ্গে টিম ডেভিডের ৪১ রানের জুটি গুজরাটের শেষ আশাটুকুও শেষ করে দেয়। ২৫ বলে নিজের অর্ধশতরান পূর্ণ করেন কোহলি। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০১৬ সালের ফাইনালের পর এবারই প্রথম আইপিএল প্লে-অফে অর্ধশতরান পেলেন তিনি।
শেষ বলেও কোহলির ছক্কা
ম্যাচের একমাত্র উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত আসে ১৬তম ওভারে। কোহলির একটি ক্যাচ ধরার চেষ্টা করেন শুভমান গিল। তৃতীয় আম্পায়ারের দীর্ঘ পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় ‘নট আউট’। এরপর আর কোনও বাধা ছিল না। শেষ পর্যন্ত ৪২ বলে অপরাজিত ৭৫ রান করে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন কোহলি। আরসিবির ঐতিহাসিক অভিযানের সমাপ্তিও হয় তাঁর ব্যাট থেকেই। জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রান আসে একটি বিশাল ছক্কায়।
নতুন যুগের সূচনা
২০২৫ সালে প্রথম শিরোপা জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, সেটি হয়ত দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া একবারের সাফল্য। কিন্তু ২০২৬ সালের অভিযান স্পষ্ট করে দিল, আরসিবি এখন কেবল জনপ্রিয় দল নয়, তারা এক শক্তিশালী ক্রিকেট সাম্রাজ্য। ১৮ বছর অপেক্ষা করে প্রথম ট্রফি জিতেছিল বেঙ্গালুরু। এরপর মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় শিরোপা। টানা দুইবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয়ে রজত পাটিদার, বিরাট কোহলি, জশ হ্যাজেলউড, ভুবনেশ্বর কুমারদের এই দল জানিয়ে দিল— ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন এক শক্তির উত্থান হয়েছে। আর সেই সাম্রাজ্যের রং নিঃসন্দেহে লাল।

Leave a Reply