সুশান্ত দাস
আবুধাবি শুধু অস্ত্র কিনতে চাইছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিবেশে ভারতের সঙ্গে আরও গভীর কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে…
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য বড় সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (ইউএই) ভারতের অন্যতম অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশতীর বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেনার বিষয়ে ভারতের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা শুরু করেছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান-ইজরায়েল-আমেরিকা সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নিচ্ছে ইউএই। একই সঙ্গে দেশটি তার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে একক উৎসের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চাইছে।
দ্রুত এগোচ্ছে ভারত-ইউএই প্রতিরক্ষা আলোচনা
সূত্রের খবর, ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একাধিক প্ল্যাটফর্মের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে আবুধাবি। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশতীর। এক সরকারি সূত্রের বক্তব্য, “ইউএই আমাদের বেশ কয়েকটি অস্ত্র ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। ব্রহ্মস এবং আকাশতীর নিয়ে আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও তা দ্রুত এগোচ্ছে।” যদিও এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত ভারত সরকার বা ইউএই প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।
কেন প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াতে চাইছে ইউএই?
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত সংঘাতের সময় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা ইউএইকে নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে বাধ্য করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএই বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন হরমুজ প্রণালী-র নিরাপত্তা নিয়ে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস রফতানি হয়। ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লে সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এছাড়া আবুধাবি এখন এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুঁজছে যা দ্রুতগতির ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য আকাশপথের হুমকিকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম।
কী এই আকাশতীর?
আকাশতীর হল ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থা ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য—
- ● যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন সেন্সর ও রাডার থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ
- ● হুমকি শনাক্তকরণ ও বিশ্লেষণ
- ● বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয়
- ● স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ
- ● দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশতীর মূলত একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক, যা বিভিন্ন অস্ত্র ও সেন্সরকে একত্রে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করে।
ব্রহ্মস: ভারতের গর্ব
ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মস বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম কার্যকর সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলির অন্যতম।
ব্রহ্মসের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য—
- ● গতি: শব্দের গতির প্রায় তিনগুণ
- ● উৎক্ষেপণ মাধ্যম: স্থল, জল ও আকাশ
- ● রফতানি সংস্করণের পাল্লা: প্রায় ২৯০ কিলোমিটার
- ● অত্যন্ত নির্ভুল লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা
- ● শত্রুপক্ষের রাডার এড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা
যেহেতু ব্রহ্মস যৌথভাবে ভারত ও রাশিয়ার তৈরি, তাই ইউএই-কে এই ক্ষেপণাস্ত্র রফতানি করতে হলে মস্কোর অনুমোদন প্রয়োজন হবে। তবে সূত্রের দাবি, রাশিয়া ও ইউএই-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে এই অনুমোদন বড় বাধা হওয়ার সম্ভাবনা কম।
মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়
বর্তমানে ইউএই-এর কাছে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—
- ● থাড (টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স)
- ● প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
- ● এমজিএম-১৬৮ অ্যাটাকমস ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
বিশ্লেষকদের মতে, আকাশতীর এই বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলির মধ্যে আরও উন্নত সমন্বয় ঘটাতে পারে এবং আকাশপথে আসা হুমকি মোকাবিলার ক্ষমতা বাড়াতে পারে।
ভারত-ইউএই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
গত কয়েক বছরে ভারত ও ইউএই-এর সম্পর্ক শুধু বাণিজ্য বা জ্বালানি সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দুই দেশ প্রতিরক্ষা উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দ্রুত এগিয়েছে। ইতিমধ্যেই দুই দেশ যৌথভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির জন্য একাধিক চুক্তি করেছে। ফলে সম্ভাব্য ব্রহ্মস ও আকাশতীর চুক্তিকে কেবল অস্ত্র বিক্রি হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর কৌশলগত অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরব-পাকিস্তান সমীকরণের প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনার পেছনে বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বেড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারত ও ইউএই-এর মধ্যে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তা বহন করে। দক্ষিণ এশিয়ার সংঘাত ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ পার্ল পাণ্ডিয়ার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ভারত-ইউএই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও সম্পর্কের গভীরতাকেই তুলে ধরছে।
প্রতিরক্ষা রফতানিতে ভারতের উত্থান
গত এক দশকে ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানি অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী—
- ● ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে প্রতিরক্ষা রফতানি ছিল মাত্র ৬৮ কোটি টাকা
- ● ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তা বেড়ে ৩৭,৮৬৮ কোটিরও বেশি হয়েছে
- ● প্রথমবারের মতো প্রতিরক্ষা রফতানি ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে সফল ব্যবহারের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় অস্ত্রের প্রতি আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কোন কোন দেশ ব্রহ্মস কিনছে?
ভারত ইতিমধ্যেই ফিলিপিন্সকে ব্রহ্মস সরবরাহ করেছে। এছাড়া ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে রফতানি চুক্তি করেছে। পাশাপাশি তাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল এবং চিলি-সহ একাধিক দেশ ব্রহ্মসের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিশ্ব অস্ত্রবাজারে ভারতের অবস্থান
প্রতিরক্ষা রফতানিতে দ্রুত অগ্রগতি হলেও ভারত এখনও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)-এর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানির ৮ শতাংশেরও বেশি ভারতের দখলে।
অন্যদিকে ২০২১-২৫ সময়কালে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে—
- ● প্রথম স্থানে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (৫৪ শতাংশ)
- ● দ্বিতীয় স্থানে ইতালি (১২ শতাংশ)
- ● তৃতীয় স্থানে ফ্রান্স (১১ শতাংশ)
ভারত-আমিরশাহী কূটনীতিতে নয়া মাইলফলক
ব্রহ্মস ও আকাশতীর রফতানি নিয়ে ভারত-ইউএই আলোচনা সফল হলে তা শুধু ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য নয়, বরং ভারতের কৌশলগত কূটনীতির ক্ষেত্রেও একটি বড় মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় ভারতের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রতিরক্ষা উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করবে যে ভারত এখন শুধু বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক নয়, বরং দ্রুত উত্থানশীল একটি প্রতিরক্ষা রফতানিকারক শক্তিও।

Leave a Reply