Mohan Bhagwat: “বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য, ভিন্নতাকে সম্মান করাই ভারতীয় সভ্যতার মূল কথা”, লন্ডনে বললেন ভাগবত

mohan-bhagwat-hindu-cultural-civilisational-identity-rss-hindu-rashtra-london

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: “ভারতের সভ্যতাগত পরিচয়ের মূলে রয়েছে বৈচিত্র্য ও ঐক্যের সহাবস্থান। মানুষের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তাকে সম্মান করা উচিত। কারণ এই বৈচিত্র্য আসলে একই অন্তর্নিহিত ঐক্যের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ।” রবিবার লন্ডনে আয়োজিত ‘একাত্মতা উদ্‌যাপন’ অনুষ্ঠানে এমনই মন্তব্য করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) প্রধান মোহন ভাগবত (Mohan Bhagwat)।

তিনি বলেন, বৈচিত্র্য স্বাভাবিক বিষয়। তাই মানুষের মধ্যে কী কী পার্থক্য রয়েছে, তার বদলে কোন বিষয়গুলি তাঁদের একসূত্রে বাঁধে, সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “হিন্দু সভ্যতা সবসময় এই উপলব্ধির উপর প্রতিষ্ঠিত যে, অস্তিত্ব মূলগতভাবে এক, যদিও তা বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত হয়। বৈচিত্র্য স্বাভাবিক; এই পার্থক্যগুলি একই অন্তর্নিহিত ঐক্যের বিভিন্ন প্রকাশ বা অলংকারমাত্র।”

ভারতের অগ্রগতির সঙ্গে শান্তির সম্পর্ক (Mohan Bhagwat)

ভারতের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের কথাও তুলে ধরেন ভাগবত। তাঁর দাবি, ভারত এগিয়ে গেলে স্বৈরশাসন বা যুদ্ধের জন্ম হয় না। বরং ভারতের অগ্রগতি শান্তি, সমৃদ্ধি, আনন্দ এবং ভ্রাতৃত্বের বার্তা বহন করে।

ভাগবত বলেন, “ভারত এগিয়ে গেলে কখনও কোনও স্বৈরশাসকের সৃষ্টি হয় না। ভারত এগিয়ে গেলে কখনও কোনও যুদ্ধ শুরু হয় না। ভারত সমগ্র মানবজাতির মধ্যে শান্তি, আনন্দ, সমৃদ্ধি ও ভ্রাতৃত্ব এবং প্রকৃতির সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলে।”

তাঁর মতে, শাসক, সরকার কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, কিন্তু জাতি হিসেবে ভারতের অস্তিত্ব অব্যাহত থেকেছে।

তিনি বলেন, “কখনও আমাদের প্রজাতন্ত্র ছিল। কখনও আমরা অন্যদের শাসনের অধীনে ছিলাম। কখনও স্বাধীনতার জন্য আমরা দীর্ঘ সংগ্রাম করেছি। কিন্তু সবসময়ই আমরা একটি জাতি হিসেবে ছিলাম।”

হিন্দু রাষ্ট্র’ সম্পর্কে আরএসএসের অবস্থান ব্যাখ্যা

‘হিন্দু রাষ্ট্র’ সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে ভাগবত বলেন, এই শব্দবন্ধকে শুধুমাত্র একটি রাষ্ট্রের ধারণা হিসেবে দেখলে হবে না।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্র মানেই জাতি নয়। রাষ্ট্রের প্রথমেই একটি উদ্দেশ্য থাকে। হিন্দু রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কী? বিশ্বের কাছে এই সত্য তুলে ধরা যে বৈচিত্র্য স্বাভাবিক এবং ঐক্যই সত্য। এতে সমগ্র বিশ্বেরই কল্যাণ হবে।”

ভাগবতের বক্তব্য, হিন্দু পরিচয়কে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ অর্থে দেখলে হবে না। এটি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত ধারণা।

তিনি (Mohan Bhagwat) বলেন, “হিন্দু মূলত একটি সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত পরিচয়—জীবন, অস্তিত্ব এবং বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে বোঝার একটি পদ্ধতি।”

ঐক্যের জন্য একরূপতা জরুরি নয়

ঐক্য মানেই যে সকলকে একই রকম হতে হবে, এমন ধারণাও খারিজ করেন ভাগবত। তাঁর মতে, বৈচিত্র্য বজায় রেখেই ঐক্য সম্ভব।

তিনি বলেন, “সকলকে একরকম করে দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা আমাদের নেই, কারণ ঐক্যের জন্য একরূপতা অপরিহার্য নয়। আমাদের সভ্যতাগত উপলব্ধি হল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য—আমরা বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করি (RSS)।”

সব পথকেই স্বীকৃতি দেয় হিন্দু চিন্তা

হিন্দু চিন্তাধারা কোনও একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পথ অনুসরণ করার জন্য মানুষকে বাধ্য করে না এবং অন্যদের ধর্মান্তরিত করারও চেষ্টা করে না বলে দাবি করেন ভাগবত।

তিনি বলেন, “আমরা যখন ‘হিন্দু’ বলি, তখন সংকীর্ণ অর্থে কোনও একটি ধর্মকে বোঝাই না। হিন্দুদের মধ্যে বহু ধর্মীয় ধারা ও পরম্পরা রয়েছে, কিন্তু অন্তর্নিহিত হিন্দু চিন্তা সব পথকেই গ্রহণ করে।”

তাঁর বক্তব্য, একই সত্যে পৌঁছনোর জন্য মানুষের বিভিন্ন পথ থাকতে পারে এবং হিন্দু চিন্তাধারা সেই সহাবস্থানকে স্বীকৃতি দেয়।

ভাগবত বলেন, “আমরা যখন বলি হিন্দু কোনও ধর্ম নয়, তার অর্থ এই নয় যে হিন্দু ধর্ম থাকতে পারে না। হিন্দু ধর্ম বলে, অন্যান্য ধর্মগুলিও সত্য।”

প্রকৃতির প্রতিও হিন্দু জীবনদর্শনে গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, “একজন হিন্দু পরিবার, সম্প্রদায়, সমাজ এবং মানবতার সঙ্গে যুক্ত। একজন হিন্দু শুধু উপাসনা করে না, প্রকৃতিকেও ভালোবাসে।”

বিভাজনের বদলে ঐক্যের জায়গাগুলিতে জোর দেওয়ার আহ্বান

মানুষ একে অপরকে শত্রু হিসেবে দেখা বন্ধ করলে সংঘাত অনেক বেশি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন ভাগবত।

তিনি (Mohan Bhagwat) বলেন, “অন্যকে সীমাবদ্ধ করা বা জয় করার চেষ্টা না করে আমাদের উপলব্ধি করা উচিত যে, শেষ পর্যন্ত আমরা সকলেই একই বিষয়গুলি অর্জন করতে চাই। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত অন্যকে কীভাবে পরাজিত করা যায়, তা নয়; বরং কীভাবে আমরা সবাই একসঙ্গে সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারি, তা।”

সমাজের প্রতি তাঁর আহ্বান, মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে এমন বিষয়গুলির পরিবর্তে যে বিষয়গুলি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে, সেগুলিতে গুরুত্ব দিতে হবে।

ভাগবত বলেন, “যে বিষয়গুলি আমাদের বিভক্ত করে, তার পরিবর্তে যে বিষয়গুলি আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে, সেগুলির উপর গুরুত্ব দিন (RSS)।”

ব্রিটিশ হিন্দুদের আনুগত্য নিয়ে ভাগবতের বক্তব্য

ব্রিটেনে বসবাসকারী হিন্দুদের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক নিয়েও বক্তব্য রাখেন ভাগবত। তাঁর মতে, একজন মানুষ যে দেশে বসবাস ও কাজ করেন, সেই দেশের প্রতি তাঁর আনুগত্য থাকা স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, “এখানে কোনও সংঘাত নেই। যদি কখনও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট যে ব্রিটিশ হিন্দু ব্রিটেনের পক্ষেই থাকবে।”

এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আপনার কর্মভূমি যেখানে, আপনার আনুগত্যও সেখানে; আর জন্মভূমি সেই জায়গা, যেখানে আপনি আপনার মূল্যবোধ পেয়েছেন।”

তরুণ প্রজন্ম নিয়ে আশাবাদী ভাগবত

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রসঙ্গেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ভাগবত। তাঁর মতে, সমাজকে আরও ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়ার তাগিদ তরুণদের মধ্যে রয়েছে এবং সেই কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর তাঁর আস্থা ক্রমশ বাড়ছে।

তিনি বলেন, “আমি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর আরও বেশি আস্থা রাখি, কারণ এই পৃথিবীকে আরও ভালো জায়গায় পরিণত করার তাগিদ তাদের মধ্যে রয়েছে। তাদের লক্ষ্য দিন, পদ্ধতি নয়। তারা দ্রুত সর্বজনীন নৈতিকতা ও সমৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করবে।”

সমাজের সেবা করতে হলে সেই কাজে এগিয়ে আসার মানসিকতা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি (Mohan Bhagwat)। তাঁর মতে, তরুণ প্রজন্ম সামাজিক বিভাজন অতিক্রম করে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে সক্ষম।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ উপলক্ষে বিদেশে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই বর্তমানে ব্রিটেনে রয়েছেন ভাগবত। আজ, ৭ সেপ্টেম্বরই শেষ হবে তাঁর (Mohan Bhagwat) লন্ডন সফর।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share