মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: “জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা হিন্দু সমাজের কলঙ্ক।” এমনই মন্তব্য করলেন আরএসএসের সরকার্যবাহ দত্তাত্রেয় হোসাবলে (Dattatreya Hosabale)। তাঁর বক্তব্য, আইন বা শুধুমাত্র বক্তৃতার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়; পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে ব্যক্তিগত আচরণ ও পরিবার থেকেই (Harmony)।
আরএসএসের শতবর্ষ উদ্যাপনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে রবিবার ভোপালের রেড প্যারেড ময়দানে আয়োজিত হয় বিরাট স্বয়ংসেবক সমাবেশ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও, একাধিক প্রতিবেদনে প্রায় ৩০ হাজার স্বয়ংসেবকের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা ছিলেন হোসাবলে। সামাজিক সম্প্রীতি, সমাজসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ, পারিবারিক মূল্যবোধ, আত্মসচেতনতা ও নাগরিক কর্তব্য—সঙ্ঘের ‘পঞ্চ পরিবর্তন’ ভাবনার বিভিন্ন দিকও অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পায়।
আত্মসমীক্ষার বার্তা (Dattatreya Hosabale)
হোসাবলে বলেন, জন্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বৈষম্য করা হিন্দু সংস্কৃতির অংশ নয়। জাতি, সম্প্রদায়, ভাষা বা অঞ্চলের ভিত্তিতে বিভাজন সমাজের সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতিভেদের নামে দুর্ব্যবহার এবং অস্পৃশ্যতার অবসান ঘটাতে হলে প্রত্যেককে নিজের আচরণের দিকে নজর দিতে হবে।তিনি বলেন, “জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা হিন্দু সমাজের কলঙ্ক। এই কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে হবে।” হোসাবলের বক্তব্যে সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নটি শুধু বাইরের সমালোচনার জবাব দেওয়ার বিষয় হিসেবে নয়, সমাজের অভ্যন্তরে আত্মসমীক্ষার বিষয় হিসেবেও উঠে আসে। জন্মের কারণে কাউকে নিকৃষ্ট মনে করা, কোনও পেশা বা শ্রমকে ছোট করে দেখা কিংবা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রবণতা দূর করার উপর জোর দেন তিনি। ভারতের সাধক-সন্তদের ঐতিহ্যের প্রসঙ্গও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। সন্ত রবিদাস, কবীর, তুকারাম, নারায়ণ গুরুর মতো ব্যক্তিত্বদের ভাবনায় সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বারবার মানুষের মধ্যে সমতার চেতনা জাগানোর কথা উঠে এসেছে। সন্ত রবিদাসের ‘বেগমপুরা’ ধারণাকেও বৈষম্য, ভয় ও সামাজিক স্তরবিন্যাসমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
বিভাজনের বদলে ভ্রাতৃত্বের উপর জোর
সামাজিক সম্প্রীতি প্রসঙ্গে সঙ্ঘের বক্তব্যে বিভিন্ন জাতি, সম্প্রদায় ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। সমস্ত হিন্দু পরস্পরের ভাই-বোন—এই ভাবনাকেও সামাজিক ঐক্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে হিন্দুত্বকে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয় বা উপাসনার পদ্ধতি হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক ঐক্য ও সভ্যতাগত সংযোগের ধারণা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়। সঙ্ঘের বক্তব্য, সমাজের শক্তি শুধু মানুষের সংখ্যার উপর নির্ভর করে না; পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও সংহতিও তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সমাজের মধ্যে কাজ করার আহ্বান
হোসাবলের বক্তব্যে স্বয়ংসেবকের সামাজিক ভূমিকার উপরও জোর দেওয়া হয়। দেশপ্রেমকে শুধু স্লোগান বা আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজসেবা ও কর্তব্যবোধের মাধ্যমে তা প্রকাশ করার আহ্বান জানানো হয়।
সমাজে দারিদ্র্য থাকলে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, কোনও শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলে তাকে সাহায্য করা, কোনও পরিবার সংকটে পড়লে সহযোগিতা করা কিংবা পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে অংশ নেওয়ার মতো কাজকে সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এই সূত্রেই ‘পঞ্চ পরিবর্তনে’র অধীনে সামাজিক (Dattatreya Hosabale) সম্প্রীতি, পরিবার সচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, আত্মসচেতনতা ও নাগরিক কর্তব্যকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। সঙ্ঘের শতবর্ষের কর্মসূচিতে এই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শ্রমের মর্যাদাই সামাজিক সম্প্রীতির অন্যতম ভিত্তি
সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গে শ্রমের মর্যাদাকেও যুক্ত করা হয়েছে। ভোপালে সন্ত রবিদাস জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত ‘শ্রম সাধক সঙ্গমে’র প্রসঙ্গেও হোসাবলে শ্রমের মর্যাদা ও সামাজিক ভ্রাতৃত্বের কথা তুলে ধরেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোনও ব্যক্তির পেশার কারণে তাঁকে নিকৃষ্ট মনে করার প্রবণতার বিরোধিতা করে বলা হয়েছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কৃষক, কারিগর, শ্রমিক, সেনাকর্মী, শিক্ষক কিংবা বিজ্ঞানী—প্রত্যেকের শ্রমই সমাজ ও দেশ গঠনে পৃথক ভূমিকা (Harmony) পালন করে।
সামাজিক সম্প্রীতি তাই কেবল একসঙ্গে বসা বা আনুষ্ঠানিক মিলন নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে একে অপরকে গ্রহণ করার মানসিকতাও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দেশপ্রেমের অর্থ
দেশপ্রেমকে শুধু পতাকা, গান বা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন জীবনে সামাজিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করাকে দেশপ্রেমের বাস্তব প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে স্বয়ংসেবকের কাছে একটি আত্মসমীক্ষার প্রশ্নও উঠে আসে—দেশের জন্য তিনি কী বলেছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, দেশের জন্য তিনি কী করেছেন।
তাঁর কাজের ফলে সমাজে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি কতটা বৃদ্ধি পেল, সেই প্রশ্নও বিবেচনার বিষয় বলে তুলে ধরা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ বিভাজন দূর করার বার্তা
হোসাবলের বক্তব্যে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার বিরোধিতা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনও জাতিকে নিকৃষ্ট বা হীন মনে করার মানসিকতাকেও সমানভাবে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মন্দির থেকে পাড়া, গ্রাম থেকে মহানগর এবং শ্রমজীবী থেকে বিদ্বান—সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ যেন সমানভাবে নিজেদের এই বৃহত্তর সামাজিক পরিসরের অংশ বলে মনে করেন (Dattatreya Hosabale), সেই প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই দৃষ্টিতে সামাজিক সম্প্রীতি শুধুমাত্র কোনও সাংগঠনিক কর্মসূচি নয়; বৃহত্তর সামাজিক প্রয়োজন হিসেবেও বিষয়টি সামনে আসে।
সমাজসেবা থেকে সংগঠন, সংগঠন থেকে জাতীয় শক্তি
সঙ্ঘের শতবর্ষের কর্মসূচির প্রেক্ষিতে সমাজসেবা, সামাজিক সম্প্রীতি ও দেশপ্রেমকে পরস্পর সম্পর্কিত মূল্যবোধ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। শৃঙ্খলা, সততা, দেশপ্রেম ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধের মাধ্যমে স্বয়ংসেবকদের সমাজের সঙ্গে যুক্ত করার কথাও সংগঠনের বিভিন্ন বক্তব্যে উঠে এসেছে।
একটি সংগঠনের সামাজিক ভূমিকা শেষ পর্যন্ত সমাজে তার বাস্তব অবদানের মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়—এই ধারণাকেই এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজসেবা, সচেতনতা বৃদ্ধি কিংবা সংকটের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাজের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার কথা বলা হয়েছে (Harmony)।
“প্রথমে নিজেদের সমাজকে শক্তিশালী করতে হবে”
ভোপালের বক্তব্যকে বৃহত্তর অর্থে হিন্দু সমাজের অভ্যন্তরে আত্মসমীক্ষার আহ্বান হিসেবেও দেখা যেতে পারে। জাতিগত অহংকার থেকে বেরিয়ে আসা, অস্পৃশ্যতার মতো সামাজিক কুপ্রথা দূর করা, শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, পরিবারকে মূল্যবোধ ও সংস্কারের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, পরিবেশ রক্ষা এবং নাগরিক দায়িত্বকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই ধারার মূল বক্তব্য হল, সমাজের কোনও মানুষ যেন নিজের সমাজেই নিজেকে বহিরাগত বলে মনে না করেন।
হিন্দুত্বকে সাংস্কৃতিক ঐক্যের ধারণা হিসেবে দেখা (Dattatreya Hosabale) হলে, সেই ধারণার বাস্তব প্রকাশ কীভাবে ঘটবে—সেই প্রশ্নও আলোচনায় আসে। জাতিগত পরিচয়ের আগে মানুষের মানবিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া, সামাজিক দূরত্ব কমানো এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বাড়ানোকে তার একটি সম্ভাব্য প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
হোসাবলের ভোপাল-বার্তার সারকথা হল, জাতিভেদের ঊর্ধ্বে সম্প্রীতি, বিভাজনের ঊর্ধ্বে ভ্রাতৃত্ব, অধিকারবোধের ঊর্ধ্বে কর্তব্য এবং শুধু চিন্তার বদলে সমাজসেবায় সক্রিয় অংশগ্রহণ। তাঁর বক্তব্য, বৈচিত্র্যকে বিভাজনের কারণ না করে (Harmony) সম্মিলিত শক্তি ও সভ্যতাগত ঐক্যের ভিত্তিতে পরিণত করাই সামাজিক সংহতির অন্যতম লক্ষ্য (Dattatreya Hosabale)।

Leave a Reply