Rafale vs J-16: রাফাল বনাম জে-১৬! চিনা যুদ্ধবিমানের সঙ্গে মিশরের রাফালের ‘ডগফাইট’, কেন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে ভারত?

chinese-j16-vs-egyptian-rafale-dogfight-wargame-china-egypt-eagles-of-civilisation-air-exercise-india-keep-watch

সুশান্ত দাস

চিন ও মিশরের যৌথ বিমান মহড়া  ‘ঈগল্স অফ সিভিলাইজেশন’ (Eagles of Civilisation) ঘিরে নতুন করে নজর পড়েছে ভারতীয় বায়ুসেনার রাফাল যুদ্ধবিমানকে নিয়ে। ২২ অগাস্ট শুরু হওয়া এই মহড়ায় প্রথমবারের মতো চিনের অত্যাধুনিক জে-১৬ (J-16) ফাইটার জেট মিশরের রাফালের বিরুদ্ধে সরাসরি সিমুলেটেড এয়ার কমব্যাটে অংশ নিয়েছে। ফলে চিনা পাইলটদের সামনে এমন একটি পশ্চিমী নকশার যুদ্ধবিমানকে কাছ থেকে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যে ধরনের যুদ্ধবিমান ভারতীয় বায়ুসেনাও ব্যবহার করে। তবে এই মহড়াকে সরাসরি ভারতীয় বায়ুসেনার রাফালের বিরুদ্ধে চিনা জে-১৬-এর পরীক্ষা হিসেবে দেখলে বিষয়টি অতিরঞ্জিত হবে। কারণ মিশরীয় ও ভারতীয় রাফালের অস্ত্র, সেন্সর, সফটওয়্যার, মিশন কনফিগারেশন এবং অপারেশনাল ডকট্রিন এক নয়। তা সত্ত্বেও চিনের জন্য এই মহড়া যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং ভারতের কাছেও বিষয়টি নজর রাখার মতো।

কী ঘটছে চিন-মিশরের বায়ুসেনা মহড়ায়?

চিন ও মিশরের বিমানবাহিনী যৌথভাবে এই মহড়া পরিচালনা করছে। মহড়ার প্রথম পর্যায়ে মূলত এক বনাম এক বিমানযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। চিনা ও মিশরীয় পাইলটরা একে অপরের যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা সম্পর্কে তথ্য বিনিময় করছেন। এর পাশাপাশি বিমান নিরাপত্তা বিধি, আকাশসীমা ব্যবহারের নিয়ম, টেক-অফ ও ল্যান্ডিং পদ্ধতি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, সেই বিষয়গুলিও অনুশীলন করা হচ্ছে। চিনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) এয়ার ফোর্স জানিয়েছে, মহড়া ধাপে ধাপে আরও জটিল হবে। প্রথমে এক বনাম এক লড়াইয়ের পর দুই বনাম দুই এয়ার কমব্যাট এবং পরে আরও জটিল যৌথ বিমান অভিযান অনুশীলন করা হবে।

প্রথমবার রাফালের বিরুদ্ধে জে-১৬

এই মহড়ার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, চিনা জে-১৬ প্রথমবার রাফালের সঙ্গে সিমুলেটেড কমব্যাট পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পেল। চিন সাধারণত নিজেদের তৈরি বিভিন্ন যুদ্ধবিমানের মধ্যে প্রশিক্ষণ এবং ডগফাইট অনুশীলন করে। কিন্তু পশ্চিমী প্রযুক্তি ও নকশার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। সেই জায়গা থেকেই মিশরের রাফাল চিনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সিমুলেটেড এয়ার কমব্যাটের মাধ্যমে চিনা পাইলটরা রাফালের উড়ানগত বৈশিষ্ট্য, ম্যানুভারিং ক্ষমতা এবং সম্ভাব্য কৌশলগত আচরণ সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পেতে পারেন। অর্থাৎ, শুধু জে-১৬ কীভাবে উড়বে বা আক্রমণ করবে, তা নয়— প্রতিপক্ষ হিসেবে রাফালকে সামনে রেখে চিনা পাইলটদের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ভারতের রাফালের সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায়?

এখানেই বিষয়টি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় বায়ুসেনার অন্যতম প্রধান আধুনিক যুদ্ধবিমান হল দাসো রাফাল। ফলে মিশরের রাফালের বিরুদ্ধে চিনা জে-১৬-এর প্রশিক্ষণকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি ঘটনা হিসেবে দেখা কঠিন। চিনা বিমান বিশেষজ্ঞ ওয়াং ইয়ানানও উল্লেখ করেছেন, রাফাল সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে এই মহড়া চিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করছে। কারণ ভারত ও মিশর—দুই দেশই রাফালের প্রধান ব্যবহারকারী। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মিশরের রাফাল এবং ভারতের রাফাল একই পরিবারের যুদ্ধবিমান হলেও তাদের অস্ত্রভাণ্ডার, সেন্সর, সফটওয়্যার, ডেটা-লিঙ্ক, মিশন সিস্টেম এবং অপারেশনাল ব্যবহারে পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে মিশরীয় রাফালের বিরুদ্ধে জে-১৬-এর অভিজ্ঞতাকে সরাসরি ভারত-চিন আকাশযুদ্ধের মহড়া বলা ঠিক হবে না।

জে-১৬ বনাম রাফাল: চিন কী শিখতে পারে?

চিনা পাইলটদের জন্য এই ধরনের প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমানের আচরণ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা তৈরি করা। রাফালের বিরুদ্ধে সিমুলেটেড কমব্যাটে চিনা পাইলটরা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন—

  • ● রাফাল কীভাবে আক্রমণাত্মক ম্যানুভার করে
  • ● কাছাকাছি আকাশযুদ্ধে তার গতিবিধি কেমন
  • ● বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রাফালের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে
  • ● জে-১৬-এর কৌশলগত অবস্থান কীভাবে পরিবর্তন করা যায়
  • ● কোন ধরনের পরিস্থিতিতে জে-১৬ পাইলটদের কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করা উচিত

এই অভিজ্ঞতা শুধু পাইলটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রশিক্ষক, কৌশলবিদ এবং সামরিক পরিকল্পনাকারীরাও এই মহড়া থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে ভবিষ্যতের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং এয়ার-কমব্যাট ট্যাকটিক্স আরও উন্নত করতে পারেন।

কতটা শক্তিশালী চিনের জে-১৬?

জে-১৬ চিনা বায়ুসেনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভারী শ্রেণির, দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট মাল্টিরোল ফাইটার। বিভিন্ন ধরনের আকাশযুদ্ধ এবং স্ট্রাইক মিশনে ব্যবহারের জন্য বিমানটিকে তৈরি করেছে চিন। অন্যদিকে রাফালও একটি অত্যাধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার, যা আকাশ প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে গ্রাউন্ড অ্যাটাক—বিভিন্ন ধরনের মিশনে ব্যবহার করা যায়। তাই জে-১৬ ও রাফালের মধ্যে সিমুলেটেড কমব্যাট চিনা পাইলটদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ পরিস্থিতি তৈরি করে। তবে এই ধরনের মহড়ার ফলাফল দেখেই কোনও একটি যুদ্ধবিমান অন্যটির তুলনায় নিশ্চিতভাবে শ্রেষ্ঠ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। কারণ আধুনিক আকাশযুদ্ধে শুধু বিমানটির ক্ষমতাই নয়, পাইলটের দক্ষতা, অস্ত্র, সেন্সর, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ডেটা-লিঙ্ক, এয়ারবর্ন আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম এবং সামগ্রিক যুদ্ধকৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

ভারতের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই মহড়া?

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল উদ্বেগের জায়গা হল—চিনা বায়ুসেনা এমন একটি যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছে, যার একটি সংস্করণ ভারতীয় বায়ুসেনার হাতেও রয়েছে। ভারত-চিন সীমান্তে ভবিষ্যতে আকাশযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে রাফাল চিনা বিমানবাহিনীর সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে। সেই কারণে চিনা পাইলটদের রাফালের উড়ানগত আচরণ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা তৈরি হওয়া ভারতের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের নজর এড়াবে না।

তবে মিশরীয় রাফালের বিরুদ্ধে মহড়া মানেই চিন ভারতীয় রাফালের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে—এমনটা বলা যাবে না। কারণ ভারতীয় রাফাল শুধু একটি বিমান নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভারতীয় অস্ত্রব্যবস্থা, সেন্সর, সফটওয়্যার, ডেটা-লিঙ্ক, প্রশিক্ষণ ও নিজস্ব অপারেশনাল কৌশল। ফলে মিশরীয় রাফালকে সামনে রেখে চিন যে অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, তা ভারতের ক্ষেত্রে আংশিকভাবে প্রাসঙ্গিক, কিন্তু সম্পূর্ণ সমতুল্য নয়।

‘ঈগল্স অফ সিভিলাইজেশন’ কেন নজরে রাখছে নয়াদিল্লি?

এই মহড়ার তাৎপর্য শুধু চিন-মিশরের সামরিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়। চিনের জন্য এটি পশ্চিমী নকশার একটি উন্নত যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণের বিরল সুযোগ। আর ভারতের জন্য এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়। চিনা বায়ুসেনা যত বেশি রাফালের মতো যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ করবে, তত বেশি তাদের পাইলট ও প্রশিক্ষকদের কাছে এই প্ল্যাটফর্মের আচরণ পরিচিত হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতে ভারত-চিন উত্তেজনা বাড়লে এই অভিজ্ঞতা চিনা কৌশল নির্ধারণে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, ভারতের কাছেও এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে—আধুনিক আকাশযুদ্ধে শুধু উন্নত যুদ্ধবিমান হাতে থাকলেই হবে না, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ সেই যুদ্ধবিমান সম্পর্কে কতটা জানে এবং তার মোকাবিলায় কী ধরনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘ঈগল্স অফ সিভিলাইজেশন’-এ জে-১৬ ও রাফালের মুখোমুখি হওয়া কোনও সরাসরি ভারত-চিন যুদ্ধের মহড়া নয়। কিন্তু এটি এমন একটি প্রশিক্ষণ অভিজ্ঞতা, যা চিনা বায়ুসেনাকে রাফাল সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিচ্ছে। আর সেই কারণেই ভারতীয় বায়ুসেনার রাফালকে ঘিরে এই চিন-মিশর মহড়ার দিকে কৌশলগত নজর রাখা স্বাভাবিক।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share