মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ফের উত্তপ্ত হরমুজ প্রণালী। জাহাজ বাজেয়াপ্ত করার পরেই বদলা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ইরান (Iran)। রীতিমতো হুঁশিয়ারির সুরে বলেছিল, ‘এটা যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন। উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।’ তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমেরিকার (America) রণতরীতে ড্রোন হামলা চালাল ইরানের সেনা। এই ঘটনায় সংঘর্ষ বিরতি (Iran-US War) ভেঙে পশ্চিম এশিয়ায় (West Asia in War) ফের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। চিন থেকে ইরানগামী একটি পণ্যবাহী জাহাজ গুলি চালিয়ে মার্কিন সেনা দখল করে নেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে (US Seizes Iranian Cargo Ship)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সামাজিক মাধ্যমে জাহাজটি আটকের কথা নিশ্চিত করেছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান সাফ জানিয়েছে বদলা তারা নেবেই। ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালী পার করার সময় হামলার শিকার হয়েছে দুটি ভারতীয় জাহাজও (Indian-Flagged Vessels Attacked)।
ইরানের পাল্টা
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে। ইরান দাবি করেছে, ওমান সাগর এলাকায় মার্কিন সামরিক জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলা হয়েছে মার্কিন বাহিনীর ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালানো ও সেটি আটক করার ঘটনার পাল্টা হিসেবে। তবে হামলার পরিমাণ, কয়টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বা মার্কিন জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না—এই বিষয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ইরানের সংবাদসংস্থা তাসনিম শুধু দাবি করেছে, গুলি চালিয়ে একটি বাণিজ্যিক জাহাজের দখল নিয়েছে আমেরিকান সেনা। তার পাল্টা হিসেবে ড্রোন হামলা করেছে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস।
ইরানি জাহাজে মার্কিন হামলা
রবিবার মাঝরাতে ‘টৌস্কা’ (TOUSKA) নামে একটি কার্গো জাহাজ আটক করে আমেরিকান সেনা। ইরানের দাবি, জাহাজটি চিন থেকে ইরানের দিকে যাচ্ছিল। হরমুজ প্রণালীর কাছে ওমান উপসাগরে তার উপরে হামলা চালানো হয়। প্রথমে গুলি করে জাহাজের ইঞ্জিন রুমে ফুটো করে দেয় আমেরিকান সেনা। তার পরে পুরো জাহাজের দখল নেয় তারা। এই ঘটনা যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের জলজ্যান্ত উদাহরণ বলে দাবি করে ইরানের সামরিক কম্যান্ডের এক মুখপাত্র বলেন, ‘জলদস্যুর মতো আচরণ করেছে আমেরিকা। এটা যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের উদাহরণ।’ আমেরিকান সেনার গুলিতে জাহাজটির নেভিগেশন সিস্টেম বিকল হয়ে গিয়েছিল বলে দাবি ইরানের। ফলে তারা থামতে বাধ্য হয়। ওই মুখপাত্রের কথায়, ‘এর পরেই আমেরিকান সেনা জাহাজে উঠে পড়ে। আমরা এর উপযুক্ত জবাব দেব।’
মার্কিন অভিযানে ইরানি জাহাজ আটক
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অবরোধ অমান্য করে জাহাজটি হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ করেছিল। ইরানের পতাকা লাগানো জাহাজটি বান্দার আব্বাস বন্দরের দিকে যাওয়ার সময় মার্কিন সেনারা সেটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং নিয়ন্ত্রণে নেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, জাহাজের ভেতরে কী ধরণের পণ্য রয়েছে তা বর্তমানে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জাহাজ দখলের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রভাব পড়েছে কূটনৈতিক টেবিলে
এই ঘটনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কূটনৈতিক টেবিলে। ইরানের সাথে দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই পাকিস্তানে পৌঁছেছিল। কিন্তু তেহরান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই পরিস্থিতিতে কোনো আলোচনায় বসবে না। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদসংস্থার দাবি, ওয়াশিংটন এমন কিছু অবাস্তব দাবি করছে যা ইরানের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব।
যুদ্ধবিরতি ভাঙছে
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি শর্ত না মানে, তবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো—যেমন সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র—লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে। এর জবাবে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের অসামরিক পরিকাঠামোয় হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি থাকা দেশগুলির বিদ্যুৎ ও জল পরিশোধন কেন্দ্রেও পাল্টা আঘাত হানা হবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ট্রাম্পের ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে এখনও দুই দিন বাকি ছিল। মঙ্গলবার পর্যন্ত এই মেয়াদ থাকার কথা থাকলেও তার আগেই রণংদেহি মেজাজে দুই দেশ। ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মহম্মদরেজা আরেফ স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, “ইরানের তেল রফতানিতে বাধা দিয়ে অন্য কেউ নিরাপদে থাকবে, এমনটা ভাবা উচিত নয়। হয় সবার জন্য তেলের বাজার উন্মুক্ত থাকবে, নয়তো নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে সকলকে মূল্য দিতে হবে।”
ভারতীয় জাহাজ লক্ষ্য করেও গুলি
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আঁচে অশান্ত হরমুজ প্রণালীও। আমেরিকা শর্ত লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ তুলে ফের হরমুজ বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালী পার করার সময় হামলার শিকার হয়েছে দুটি ভারতীয় জাহাজও (Indian-Flagged Vessels Attacked)। অভিযোগ, ইরানের নৌবাহিনী ভারতীয় জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এই নিয়ে নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মহম্মদ ফাতালিকে তলব করে বিদেশমন্ত্রক। ভারতীয় জাহাদের উপর হামলার বিরোধিতা করে ইরানকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। জাহাজের উপর এই হামলা ওমানের কাছে ঘটেছে। ব্রিটেন দাবি করে, ইরানের নৌবাহিনী ভারতীয় জাহাজে গুলিবর্ষণ করে। তবে জাহাজ দুটির কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ঘটনায় কেউ হতাহতও হননি। তবে ফিরে যেতে হয় জাহাজ দুটিকে।
যুদ্ধের কারণে বিভ্রান্তি
এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বিদেশমন্ত্রক। মহম্মদ ফাতালির সঙ্গে বৈঠক করেন বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি। গুলি চালানোর তীব্র প্রতিবাদ করেন। ভারতমুখী জাহাজকে নিরাপদে পাঠানোর বার্তা দেন। দুই ভারতীয় জাহাজে প্রায় ২ মিলিয়ন ব্যারেল ইরাকি তেল রয়েছে। সূত্রের খবর, ইরান জানিয়েছে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালীতে। ইরানের বিভিন্ন বাহিনী ও ইউনিট একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করতে না পারায় এমনটা ঘটছে। এই যুদ্ধের সময় এর আগে আমেরিকাও ভুলবশত নিজেদের জাহাজ কিংবা তার সহযোগীদের উপর গুলি চালিয়েছে।

Leave a Reply