US Iran Peace Deal: অবশেষে মার্কিন-ইরান সংঘাতের অবসানে শান্তিচুক্তি! ডিজিটাল স্বাক্ষরে কার্যকর মউ, খুলছে হরমুজ প্রণালী

us iran peace deal trump pezeshkian digitaly sign mou to end conflict hormuz will reopen soon

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: অবশেষে স্বাক্ষরিত হল ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তি । বুধবার সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষর করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। দুই দেশের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, সমঝোতাপত্রে ডিজিটাল স্বাক্ষর করেছেন দুই প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার তরফে জানানো হয়েছে, জি৭ সম্মেলনের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর সঙ্গে নৈশভোজ করছিলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি সমঝোতাপত্রের নথিতেও সম্মতিসূচক স্বাক্ষর করেন। চুক্তি হওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে তেহরানও। এর ফলে দীর্ঘ কয়েক মাসের উত্তেজনা ও সংঘাতের আপাত অবসান ঘটল। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মূল লক্ষ্যই হল দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া।

ভার্সাই প্রাসাদে ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর

মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, বুধবার দুই রাষ্ট্রনেতার ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে চুক্তিটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। এর আগে রবিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর করেছিলেন। হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গিয়েছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর উপস্থিতিতে ভার্সাই প্রাসাদে এক নৈশভোজ অনুষ্ঠানে চুক্তির হার্ড কপিতেও স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। পরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, চুক্তিটি ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে এবং এর ছবি ইরান ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলির কাছে পাঠানো হয়েছে। ইরানের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই সে দেশের সরকারি সংবাদসংস্থা আইআরএনএ-কে বলেছেন, “দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা চূড়ান্ত হয়েছে। দুই প্রেসিডেন্ট, ট্রাম্প এবং পেজেশকিয়ান চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। তা কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার।”

জেনেভা বৈঠক থাকলেও হবে না স্বাক্ষর অনুষ্ঠান

প্রথমে জানা গিয়েছিল, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে সুইৎজারল্যান্ডের জেনেভায়, দুই দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে। তবে তার আগেই সমঝোতাপত্রে সিলমোহর পড়ায় জেনেভার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল হল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তেহরানের দাবি, জেনেভার শান্তিবৈঠক আগের সূচি মেনেই হবে। ইরানি কর্তারা জানিয়েছেন যে, শুক্রবার বৈঠকের উদ্দেশ্য চুক্তি স্বাক্ষর করা নয়। তারা জানায় যে দলিলটি ডিজিটালভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাই সুইৎজারল্যান্ডে কোনও মুখোমুখি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে না। ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমেই চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে।

তেল রফতানি ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রতিশ্রুতি

ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই জানান, চুক্তি অনুযায়ী ইরানকে বাধাহীনভাবে তেল রফতানির সুযোগ দিতে হবে এবং সেই বিক্রির অর্থ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তেহরানকে কোনও পরিবহন বা বিমা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ ছাড়াই তার তেল বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া উচিত এবং সেই বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থের উপর তার পূর্ণ অধিকার থাকা উচিত। পাশাপাশি, ইরানের আটকে থাকা অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ওয়াশিংটন। তিনি জানান, তেল সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা দ্রুত তুলে নেওয়া হবে এবং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে বৃহত্তর চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চলবে।

৬০ দিনের পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি

সমঝোতা অনুযায়ী আগামী ৬০ দিন কোনও পক্ষই এমন পদক্ষেপ নেবে না যা চুক্তিকে দুর্বল করতে পারে। নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো থেকেও বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে। বাঘেই এই ব্যবস্থাকে “প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে প্রতিশ্রুতি” বলে উল্লেখ করেছেন।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সংবেদনশীল অবস্থান

ইরান স্পষ্ট করেছে যে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো হবে না। তবে ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমানোর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চুক্তির ফারসি ও ইংরেজি উভয় সংস্করণেই একই ধরনের শর্ত রয়েছে এবং উভয় পক্ষই তাতে স্বাক্ষর করেছে।

ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার বাইরে

ইরান জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে কোনও আলোচনা হবে না। বাঘেই বলেন, “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আলোচনার জন্য নয়, ব্যবহারের জন্য তৈরি।” প্যারিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, যদি সৌদি আরব, কাতারসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকে, তাহলে ইরানকে সম্পূর্ণভাবে তা থেকে বঞ্চিত করা ন্যায্য হবে না। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন যে চুক্তি কার্যকর হলেও মার্কিন সেনাবাহিনী আপাতত উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন থাকবে।

নতুন ব্যবস্থায় খুলবে হরমুজ প্রণালী

প্রধান আলোচক কালিবাফ জানান, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুললেও তা যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরবে না। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনেই ইরান সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পাশাপাশি প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলির কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিষেবা ফি নেওয়া হবে।

৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা

চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে বলে জানান কালিবাফ। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রকল্পেও এই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে।

পাকিস্তানের দাবি

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক মাধ্যম এক্সে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারককে “ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি” বলা হচ্ছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান এই চুক্তিকে সমর্থন করেছে বলেও জানান তিনি। শরিফের মতে, চুক্তির প্রথম ধাপ হিসেবে ইরান অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। তাঁর দাবি, এই পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা প্রশমনের পথে বড় ভূমিকা নেবে এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত কূটনৈতিক সমাধানের পথ প্রশস্ত করবে।

যুদ্ধ উদ্বেগে গোটা বিশ্ব

গত ১৫ সপ্তাহ ধরে পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধ উদ্বেগে রেখেছিল গোটা বিশ্বকে। এই যুদ্ধের জেরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সঙ্কট দেখা যায়। এর প্রভাব পড়েছিল অর্থনীতিতেও। শান্তিচুক্তির অন্যতম শর্ত হিসাবে হরমুজ প্রণালীর উপর থেকেও অবরোধ এবং যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে এই জলপথ ধরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে আর কোনও বাধা রইল না বলেই মনে করা হচ্ছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, রবিবারই ইরানের সঙ্গে সমঝোতার চুক্তি স্বাক্ষরিত করবে আমেরিকা। ঘটনাচক্রে, ওই দিনেই ৮০-তে পা দেন ট্রাম্প। আমেরিকা এবং ইরান অধিকাংশ বিষয়ে একমত হলেও বেশ কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়নি। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালীতে অবাধে জাহাজ চলাচল করতে দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে ইরান। চুক্তির অন্যতম শর্ত হিসেবে ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ৬০ দিন ধরে বোঝাপড়া করতে রাজি হয়েছে বলেও দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ইরানের তরফে অবশ্য বার বারই জানানো হচ্ছিল যে, তারা চুক্তির শর্তগুলি খতিয়ে দেখছে।

 

 

 

 

 

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share