Modi At G7: জি৭-এর মঞ্চে ট্রাম্প-মাক্রঁর সঙ্গে প্রথম সারিতে মোদি, বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের উত্থানের স্পষ্ট বার্তা

pm-modi-g7-summit-2026-trump-macron-leaders-photo

সুশান্ত দাস 

ফ্রান্সের এভিয়ঁ-লে-ব্যাঁ (সংক্ষেপে এভিয়ঁ) শহরে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে এক মঞ্চে দেখা গেল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক ‘লিডার্স ফটোগ্রাফ’-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রঁর পাশে প্রথম সারিতে মোদির উপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অবস্থান শুধু প্রোটোকলের বিষয় নয়, বরং বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রতীক।

সদস্য নয়, তাও ভারতকে আমন্ত্রণ

বিশ্বের সাতটি প্রধান শিল্পোন্নত অর্থনীতির এই ফোরামে ভারত সদস্য না হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির গুরুত্ব ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান এখন বৈশ্বিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই বাস্তবতাই যেন প্রতিফলিত হয়েছে জি৭ নেতাদের এই ঐতিহাসিক ছবিতে।

মাক্রঁর বিশেষ অভ্যর্থনা, ভারত-ফ্রান্স সম্পর্কের নতুন বার্তা

সম্মেলনের শুরুতেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রঁ ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে স্বাগত জানান। তিনি সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমেও শেয়ার করেন। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ ভারত-ফ্রান্স কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ভারতের গুরুত্বকেই তুলে ধরে। প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা, পারমাণবিক শক্তি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি ও প্যারিসের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ হিসেবে ফ্রান্স বর্তমানে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার।

১৬ মাস পর মুখোমুখি মোদি ও ট্রাম্প

জি৭ সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক। প্রায় ১৬ মাস পর দুই নেতা সরাসরি মুখোমুখি হলেন। শুধু তাই নয়, সম্মেলনের মূল অধিবেশনেও তাঁদের পাশাপাশি বসতে দেখা যায়। এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রশাসনের অধীনে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। চিনকে কেন্দ্র করে পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক আগামী দিনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অক্ষ হয়ে উঠতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কেন বারবার জি৭-এ আমন্ত্রিত হচ্ছেন মোদি?

এবারের সম্মেলন ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদির সপ্তম ধারাবাহিক জি৭ অংশগ্রহণ। জি৭-এর সদস্য না হয়েও এতবার আমন্ত্রিত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ—

  • ● বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর অন্যতম ভারত।
  • ● বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারতের ভূমিকা দ্রুত বাড়ছে।
  • ● প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সবুজ শক্তি ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে নজর কেড়েছে।
  • ● উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর সমাধানে ভারতের অংশগ্রহণ এখন প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ফলে জি৭-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে ভারতের উপস্থিতি ক্রমশ স্থায়ী চরিত্র ধারণ করছে।

‘গ্লোবাল সাউথ’-এর মুখপাত্র হিসেবে ভারতের অবস্থান

গত কয়েক বছরে প্রধানমন্ত্রী মোদি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। জলবায়ু অর্থায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি সংকট, ডিজিটাল বৈষম্য এবং টেকসই উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোতে ভারতের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্ব পেয়েছে। জি২০-র সভাপতিত্বের সময়ও ভারত ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর উদ্বেগ ও প্রত্যাশাকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল। জি৭ সম্মেলনেও সেই অবস্থানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছেন মোদি।

একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সূচি

সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী মোদির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেরও কর্মসূচি রয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত সহযোগিতা এসব বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রের অনুমান।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের উত্থানের প্রতীকী বার্তা

এভিয়ানের জি৭ সম্মেলনে ট্রাম্প ও মাক্রঁর পাশে প্রথম সারিতে নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি নিছক একটি আনুষ্ঠানিক ছবি নয়। এটি এমন এক ভারতের প্রতিচ্ছবি, যা আজ বিশ্বের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ক্রমশ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশ্বের প্রভাবশালী শক্তিগুলোর সঙ্গে সমান গুরুত্বে আলোচনায় অংশগ্রহণ, বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে ভারত যে আরও একধাপ এগিয়ে গেল, জি৭ সম্মেলনের এই দৃশ্য যেন সেই বার্তাই স্পষ্ট করে দিল।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share