India Japan Defence Deal: নজরে চিন! ইন্দো-প্যাসিফিকে শক্তি বাড়াচ্ছে ভারত, জাপানের সঙ্গে সমুদ্র নিরাপত্তায় নতুন চুক্তি

india-japan-defence-deal-warship-building-military-exercises

সুশান্ত দাস

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমশ বদলে যাচ্ছে নিরাপত্তার সমীকরণ। আর সেই পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করার পথে হাঁটল ভারত ও জাপান। সমুদ্র নিরাপত্তা, সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সামরিক রসদ সরবরাহ— একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই দেশ। ২০ অগাস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বৈঠকে বসেন। বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার একাধিক পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে এই বৈঠক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জুলাই ২০২৬-এ ভারত ও জাপানের শীর্ষ নেতৃত্বের যৌথ বিবৃতির পরেই দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। দুই দেশই জানিয়েছে, ভারত-জাপান বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

সমুদ্র নিরাপত্তায় নতুন সমঝোতা

বৈঠকের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হল ভারত ও জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মধ্যে সমুদ্র নিরাপত্তা সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর। এই সমঝোতার মাধ্যমে ভারতীয় নৌবাহিনী এবং জাপানের সামুদ্রিক আত্মরক্ষা বাহিনীর মধ্যে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা আরও বাড়বে। সমুদ্র এলাকায় নজরদারি ও পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য আদানপ্রদান, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এবং মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।

বিশেষ করে সামুদ্রিক ক্ষেত্র সম্পর্কে সচেতনতা বা এমডিএ-র ক্ষেত্রে তথ্য আদানপ্রদান বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো হবে। পারস্পরিক নৌসফর, যৌথ সামরিক মহড়া, কর্মী ও বিশেষজ্ঞদের আদানপ্রদান এবং সামরিক রসদ সহায়তার বিষয়েও সহযোগিতা হবে। প্রয়োজনে একে অপরের বন্দর এবং জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের পরিকাঠামো ব্যবহারের সুযোগও তৈরি হবে।

জাপানি প্রযুক্তি, ভারতীয় উৎপাদন ক্ষমতা

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ ক্ষেত্রেও বড় সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে ভারত ও জাপান। দুই দেশ মাইন প্রতিরোধ ও মোকাবিলা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করবে। পাশাপাশি জাপানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ভারতের উৎপাদন ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যৌথভাবে নৌবাহিনীর জাহাজের নকশা ও নির্মাণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে। মেক ইন ইন্ডিয়া কর্মসূচির আওতায় জাপান কীভাবে ভারতের জাহাজ নির্মাণ পরিকাঠামো ব্যবহার করতে পারে, সেই বিষয়েও আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়াও দুই দেশের জাহাজ মেরামত কেন্দ্র পরস্পরের জন্য ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। খুব শীঘ্রই জাহাজ মেরামত সংক্রান্ত একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে দুই দেশ।

বাড়বে সামরিক মহড়ার পরিধি

ভারত ও জাপানের সামরিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল যৌথ মহড়া। বৈঠকে দুই দেশের সেনাবাহিনীর ‘ধর্ম গার্ডিয়ান’ এবং নৌবাহিনীর ‘জাইমেক্স’ মহড়ার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এছাড়াও চলতি বছর হতে চলা দুই দেশের বিমানবাহিনীর যৌথ মহড়া ‘বীর গার্ডিয়ান ২৬’ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এই মহড়ায় এবার বিশেষ নজর থাকবে। কারণ প্রথমবার জাপানের বিমান আত্মরক্ষা বাহিনীর যুদ্ধবিমান ভারতে এসে যৌথ মহড়ায় অংশ নেবে। আগামী দিনে ভারত ও জাপান যৌথ সামরিক মহড়ার জটিলতা এবং পরিধি আরও বাড়াবে। মহড়ায় মানবহীন ব্যবস্থা যুক্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প সময়ের নোটিসেও যৌথ অনুশীলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। দুই দেশের বিশেষ অভিযান বাহিনীর মধ্যেও যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণ বিনিময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভারতের সমন্বিত থিয়েটার কমান্ড ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর জাপানের সঙ্গে এই ক্ষেত্রেও সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে।

প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং জাপানের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত নীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতায় জাপানের আরও বড় ভূমিকার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি। দুই দেশের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহযোগিতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে জাপানের স্টেলথ রণতরীতে ব্যবহৃত বিশেষ ইউনিকর্ন রেডোম অ্যান্টেনা ব্যবস্থা। এটিকে ভারত ও জাপানের মধ্যে প্রথম প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম হস্তান্তর প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। একইসঙ্গে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে আরও আলোচনা করে ভবিষ্যতে নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে। উন্নত প্রতিরক্ষা গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়বে। ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও এবং জাপানের সংস্থার মধ্যে যৌথ গবেষণা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়াও দুই দেশ একটি প্রতিরক্ষা শিল্প মঞ্চ গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে।

ইন্দো-প্যাসিফিকে তৃতীয় দেশগুলির সঙ্গেও সহযোগিতা

শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, অন্যান্য দেশের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে চায় ভারত ও জাপান। ফেব্রুয়ারিতে ভারত, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর মধ্যে প্রথম ত্রিদেশীয় পাসেক্স মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রী। আগামী দিনে উচ্চপর্যায়ের সফর, সামরিক মহড়া এবং অন্যান্য উদ্যোগের মাধ্যমে তৃতীয় দেশগুলির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানো হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতায় যৌথভাবে অবদান রাখাই এর লক্ষ্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সহযোগী দেশগুলিতে দ্রুত মানুষ এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিতে ইন্দো-প্যাসিফিক লজিস্টিক নেটওয়ার্ক বা আইপিএলএন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে এই ব্যবস্থার দ্বিতীয় টেবিলটপ মহড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

দ্রুত হবে ভারত-জাপান ‘টু প্লাস টু’ বৈঠক

ভারত ও জাপানের মধ্যে চতুর্থ বিদেশ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, যা ‘টু প্লাস টু’ বৈঠক নামে পরিচিত, দ্রুত আয়োজনের বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে। চলতি বছর টোকিওতে এই বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরামর্শ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও সম্মত হয়েছে দুই দেশ। এর মাধ্যমে দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে যৌথভাবে কাজ করতে চায় নয়াদিল্লি ও টোকিও।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নজরদারির জন্য নতুন গোষ্ঠী

ভারত ও জাপানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিধি দ্রুত বাড়ছে। তাই বিভিন্ন উদ্যোগকে আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি নতুন ওয়ার্কিং গ্রুপ বা কার্যকরী গোষ্ঠী গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ডিজি বা যুগ্মসচিব পর্যায়ের এই গোষ্ঠী দুই দেশের মধ্যে সামরিক কর্মসূচি, গোয়েন্দা তথ্য, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা শিল্প সংক্রান্ত সহযোগিতার সমন্বয় করবে। বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা এবং সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের পথ তৈরি করাও এই গোষ্ঠীর অন্যতম দায়িত্ব হবে। তবে দুই দেশের নিজস্ব নীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে সম্মান করেই এই সহযোগিতা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

জাতীয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর

নয়াদিল্লিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আগে ভারতের জাতীয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে গিয়ে দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া ভারতীয় সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তিনি। এরপর তাঁকে তিন বাহিনীর সমন্বিত গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। ভারত সফরের সময় মুম্বইয়ে গিয়ে পশ্চিম নৌ কমান্ড এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ আইএনএস চেন্নাই-ও পরিদর্শন করেন তিনি। সব মিলিয়ে, সমুদ্র নিরাপত্তা থেকে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ, সামরিক মহড়া থেকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—একাধিক ক্ষেত্রে ভারত ও জাপানের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে চলেছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে দুই দেশের এই কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share